বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

পাঁচ হাজার কোটিতে নতুন ঠিকানায় বস্তিবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

রাজধানীর বুকে ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রতীক হয়ে থাকা তিনটি বড় বস্তিকে কেন্দ্র করে এক বিশাল পরিবর্তনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। কড়াইল, ভাষানটেক এবং সাততলা বস্তির হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষকে আধুনিক আবাসনের আওতায় আনতে সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি বাজেটের একটি সমন্বিত প্রকল্প চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই মহাপ্রকল্পটি সফল হলে ঢাকার বস্তি সংস্কৃতির চিরচেনা চিত্রে আমূল পরিবর্তন আসবে। নগরীর এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য বহুতল ভবনে ফ্ল্যাট নির্মাণ এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এটি হবে দেশের অন্যতম বড় ও সাহসী একটি উদ্যোগ।

প্রকল্পটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গত ৯ জুন ডিএনসিসির পক্ষ থেকে চারটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিগুলো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়ন এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো দেখভাল করছে। ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান জানিয়েছেন, কেবল বহুতল ভবন নির্মাণই এই প্রকল্পের লক্ষ্য নয়, বরং বস্তিবাসীদের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধাসমৃদ্ধ একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, বস্তির অসহায় মানুষকে মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে একটি স্থায়ী ঠিকানায় পুনর্বাসনের এই কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

প্রকল্পের পরিধি কত বিশাল, তার কিছুটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে চলমান জরিপ কার্যক্রম থেকে। বেসরকারি সংস্থা দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) এপ্রিল মাস থেকে কড়াইল, ভাষানটেক ও সাততলা বস্তিতে এক ব্যাপক জরিপ চালাচ্ছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যমতে, এই তিনটি বস্তিতে প্রায় ৩৫ হাজার পরিবার বসবাস করছে, যাদের মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। জরিপে কেবল বস্তির স্থায়ী বাসিন্দারাই নয়, বরং সেখানে বসবাসরত ভাড়াটে ও দখলদারদের তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। জুনের মধ্যেই এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার তৈরির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে, যা পরবর্তীকালে ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রধান ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

আবাসন নির্মাণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আর্থিক দিকটি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা নানা বিশ্লেষণ করছেন। বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মী—যারা সাশ্রয়ী পাকা আবাসন নিয়ে কাজ করেন—তাদের মতে, ছোট আকারে ফ্ল্যাট নির্মাণ করলেও প্রতিটি ইউনিটের জন্য অন্তত ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। সেই হিসেবে ৩৫ হাজার পরিবারের জন্য ফ্ল্যাট তৈরি করতেই অন্তত ৫ হাজার ২৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন। তবে এর সাথে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন রাস্তাঘাট নির্মাণ, খেলার মাঠ, পার্ক এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে গেলে এই ব্যয় আরও বাড়বে। আবাসন শিল্প মালিকদের সংগঠন রিহ্যাবের প্রতিনিধিরা আবার ভিন্নমত দিয়েছেন; তাদের দাবি, ১০ তলা বা ২০ তলা ভবনের নকশা ও মান অনুযায়ী খরচ বহুগুণ বাড়তে পারে। তবে সরকার কোন পদ্ধতিতে এবং কাদের মাধ্যমে এই নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করবে, তার ওপরই চূড়ান্ত বাজেট নির্ভর করছে।

তবে এই প্রকল্পের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জমির মালিকানা ও আইনি জটিলতা। কড়াইল বস্তির জমির একটি বড় অংশ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও রাজউকের নিয়ন্ত্রণে। সাততলা বস্তি দাঁড়িয়ে আছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বক্ষব্যাধি হাসপাতালের জায়গার ওপর। একইভাবে ভাষানটেক বস্তির জমি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মালিকানায় রয়েছে। সরকারি এই বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় সাধন করে জমি ছাড়িয়ে নেওয়া এবং আইনি জটিলতা নিরসন করা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার দাবি রাখে। এছাড়া, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য কোন মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষ মূল অর্থায়ন করবে এবং তদারকির দায়িত্বে কে থাকবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে বর্তমান বাসিন্দাদের আবাসন সংকট। বহুতল ভবন নির্মাণ করতে অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে। এই দীর্ঘ সময় বস্তিবাসী কোথায় থাকবে বা তাদের জীবিকার সংস্থান কীভাবে হবে, সেই প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, প্রকল্প চলাকালীন এই বিপুলসংখ্যক মানুষ সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের স্বচ্ছতা রক্ষা করা হবে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সরকারি আবাসন প্রকল্পে প্রকৃত বস্তিবাসীর চেয়ে প্রভাবশালী ও নকল সুবিধাভোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এবার যাতে তালিকায় ৭০ শতাংশ নকল বস্তিবাসী ঢুকে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

আধুনিক বহুতল ভবনে জীবনযাপনের সাথে বস্তির মানুষের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সক্ষমতার অমিলকেও বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বস্তিতে ভাড়া বা অন্যান্য খরচ যেভাবে তারা বহন করে, বহুতল ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ বা ইউটিলিটি বিলের ব্যয় তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্ল্যাট দেওয়ার পাশাপাশি এই বাসিন্দাদের আয়ের উৎস বৃদ্ধি বা কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়ালে আধুনিক ফ্ল্যাটেও তারা টিকে থাকতে পারবে না। বস্তির বাসিন্দাদের কেবল চার দেয়ালের ভেতরে নিয়ে আসাই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বিশেষ সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

এতসব চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কা সত্ত্বেও প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তাকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। আধুনিক নগর ব্যবস্থার সংজ্ঞার সাথে কড়াইল, ভাষানটেক বা সাততলা বস্তির মতো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঢাকা শহরকে একটি আধুনিক মহানগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এই ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন অপরিহার্য। তবে এটি যেন কেবল একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হয়ে সত্যিকারের মানব উন্নয়ন প্রকল্পে পরিণত হয়, সেটিই এখন বড় প্রত্যাশা।

পরিশেষে বলা যায়, পাঁচ হাজার কোটিরও বেশি বাজেটের এই আবাসন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি ঢাকার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তবে এই পথে থাকা আইনি মারপ্যাঁচ, আর্থিক স্বচ্ছতার অভাব এবং বাস্তুচ্যুত হওয়ার ভয় দূর করতে সরকারকে এক সুদূরপ্রসারী ও মানবিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের এই যাত্রায় বস্তিবাসী যদি তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে পারে, তবেই এই মহাযজ্ঞ সার্থক হবে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, দেখার বিষয় প্রশাসন এই বড় চ্যালেঞ্জকে কতটা দক্ষতার সাথে জয় করে বস্তিবাসীর মুখে হাসি ফোটাতে পারে।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...