মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই নতুন করে পারমাণবিক পরিদর্শন ইস্যু বড় ধরনের সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, গত বছর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত তাদের মূল পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের কোনোভাবেই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
সুইজারল্যান্ডের বিলাসবহুল রিসোর্টে আয়োজিত আলোচনার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে পৌঁছেছে। পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ শুরু হলেও, পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন ইস্যুতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যে বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরান দীর্ঘমেয়াদী এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের পারমাণবিক পরিদর্শনে সম্মত হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই দাবির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ সম্মেলনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, “আমরা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মহাপরিচালকের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো বৈঠক করিনি। আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের কোনো পরিকল্পনাও ইরানের নেই।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, যেহেতু গত বছর মার্কিন ও জায়নবাদী (ইসরায়েল) সামরিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে এসব স্থাপনা, তাই সেখানে বাইরের কারও পরিদর্শন মেনে নেওয়া হবে না। ইরানের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আলী বাহরাইনিও একই সুর মিলিয়ে জানিয়েছেন, পরিদর্শকদের গ্রহণের বিষয়ে তেহরান কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় বিধ্বংসী ‘বাঙ্কার-বাস্টিং’ বোমা হামলা চালায়। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল যে তারা ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতাহীন করতে স্থাপনাগুলোকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছে, কিন্তু এই হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং বর্তমানে স্থাপনাগুলোর অবস্থা এখনো বিশ্বের কাছে রহস্য হয়ে আছে। ইরান সরকার এখন পর্যন্ত এই স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছ চিত্র প্রকাশ করেনি।
এই আলোচনার মধ্যেই ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের আগের মতো ‘মুক্ত চলাচল’ আর কখনোই ফিরে আসবে না। যদিও দুই পক্ষ প্রণালীটি খোলা রাখতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে, তবুও তেহরান সেখানে তাদের সার্বভৌমত্বকেই প্রধান্য দিচ্ছে। এদিকে, শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে এবং জব্দকৃত ১২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদিও মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এই তহবিল সন্ত্রাসবাদে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
সব মিলিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনার রোডম্যাপ তৈরি হলেও, মূল পারমাণবিক ইস্যুটি নিয়ে দুই দেশের এই অনমনীয় অবস্থান শান্তি প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে, যে স্থাপনাগুলোতে হামলা হয়েছে, সেই জায়গাগুলোতে পরিদর্শক পাঠাতে না দেওয়ার অর্থ হলো—ইরান সম্ভবত তাদের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক সক্ষমতা গোপন রাখতে চায়। এখন দেখার বিষয়, আগামী ৬০ দিনের এই সংকটময় সময়সীমার মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এই জট খোলা সম্ভব হয়, নাকি পরমাণু পরিদর্শনের এই ইস্যুই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়ায়।