সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন

ওয়াশিংটনের সামরিক লাইফলাইন ছাড়া ইসরায়েলের কি টিকে থাকা সম্ভব?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের চিরতরে অশান্ত ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক একটি ঝাঁঝালো মন্তব্য নতুন করে এক ঝড়ের জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার ক্ষোভ ও অসন্তোষের কড়া জবাব দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আপনাদের একমাত্র পরম মিত্রকে আক্রমণ করবেন না।’ তিনি ইসরায়েলি নেতাদের আরও মনে করিয়ে দেন যে, ইসরায়েলকে প্রতিরক্ষাকারী দুই-তৃতীয়াংশ অত্যাধুনিক অস্ত্রই আসলে মার্কিন সাধারণ নাগরিকদের ট্যাক্সের টাকায় এবং আমেরিকার কারখানায় তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই সম্পর্ক এতটাই গভীর যে, ভারতীয় চিত্রশিল্পী ও কলামিস্ট কমলেশ সিংয়ের মতে, ‘ইসরায়েল হলো যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যের মধ্যে প্রথম।’ যদিও বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে, তবে এটি পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার সুযোগ কম। বর্তমানে উভয় রাষ্ট্রই নিজ নিজ সংকটে পড়েছে; ওয়াশিংটন যেখানে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়িয়ে গা বাঁচাতে চাইছে, সেখানে ইসরায়েল চাইছে লেবাননে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে যেকোনো মূল্যে কঠোরভাবে দমন করতে।

দুই মিত্রের মধ্যে এই বৈরিতার মূল সূত্রপাত হয় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ১৪ দফা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর। এই সমঝোতা স্মারকটি তেল আবিবে এক তীব্র অস্বস্তি ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ ঘোষণা করেছেন যে, ইসরায়েল এই মার্কিন চুক্তি মেনে চলতে কোনোভাবেই বাধ্য নয়। অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দেশের সামরিক বাহিনীকে (আইডিএফ) নির্দেশ দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে এককভাবে হামলা চালানোর জন্য যেন জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা হয়। তবে জেরুজালেম মুখে যতই হম্বিতম্বি করুক না কেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ্য হয়ে যদি ইরানে হামলা চালাতে যায়, তবে কিছু মৌলিক প্রশ্ন অবধারিতভাবে সামনে আসে—ইসরায়েল কি একা ইরানে হামলা চালাতে পারবে? বাস্তবে কি তা সম্ভব? যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো কারণে সমর্থন কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে, তবে ইসরায়েল কি নিজের শক্তিতে আত্মরক্ষা করতে পারবে?

মার্কিন আকাশ ছোঁয়া প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল আইএএফ

প্রথমেই বলা যাক ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর (আইএএফ) কথা, যাদেরকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ও অপরাজেয় বিমানবাহিনী মনে করা হলেও এর মূল চালিকাশক্তি মূলত মার্কিন অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ভারতের শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাংবাদিক সন্দীপ উন্নীথানের মতে, এটিই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতা। ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর মূল বহরে থাকা ৭৫টি এফ-১৫, ১৯৬টি এফ-১৬ এবং ৩৯টি এফ-৩৫ ফ্যান্টম যুদ্ধবিমানের সব কটিই আমেরিকার তৈরি। এ ছাড়া তাদের অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও ব্ল্যাক হক ট্রান্সপোর্ট হেলিকপ্টারগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। এসব বিমানের ইঞ্জিন বা রাডার সিস্টেমের মতো জরুরি খুচরা যন্ত্রাংশ নিয়মিত মার্কিন কোম্পানি থেকে কিনতে হয়। আমেরিকা যদি এই যন্ত্রাংশের জোগান বন্ধ করে দেয়, তবে ইসরায়েলের যুদ্ধবিমানগুলো ওড়ার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলবে।

দ্বিতীয়ত আসে ইসরায়েলের নিজস্ব অস্ত্রের মজুতের সীমাবদ্ধতা। দীর্ঘমেয়াদি বা বহুমুখী ফ্রন্টের যুদ্ধে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত হাই-টেক গোলাবারুদের নিজস্ব মজুত ইসরায়েলের নেই। তারা আমেরিকার তৈরি গাইডেড জেডিএএম (JDAM) কিট ও জিবিইউ-৩৯/বি স্মল ডায়ামিটার বোমার ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। এমনকি হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যার জন্য ব্যবহৃত বিএলইউ-১০৯ বাংকার বাস্টার বোমাটিও ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া। ২০২৫ সালে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে ইসরায়েলের যে বিশেষ ভারী বোমার (জিবিইউ-৫৭) প্রয়োজন ছিল, যা আমেরিকার সরাসরি সহায়তা ছাড়া তাদের পক্ষে পাওয়া বা ব্যবহার করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

এরপর আসে তাদের গর্বের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ইসরায়েলের বিখ্যাত ‘আয়রন ডোম’ ব্যবস্থাটি তাদের নিজেদের ডিজাইন করা হলেও এটি তৈরি হয় মার্কিন প্রতিরক্ষা জায়ান্ট আরটিএক্সের যৌথ উদ্যোগে। এই ব্যবস্থার তামির মিসাইল এবং ডেভিডস স্লিংয়ের স্টানার মিসাইলের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও আমেরিকায় তৈরি হয়। তা ছাড়া মার্কিন কংগ্রেস এই আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য নিয়মিত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল জুগিয়ে আসছে। যখনই ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ড্রোন ও মিসাইল হামলায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, তখনই মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি নিজস্ব প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করে ইসরায়েলকে প্রচ্ছন্ন রক্ষা করেছে।

সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হওয়া কেন ইসরায়েলের পক্ষে অসম্ভব?

এ বিষয়ে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক উপপ্রধান চাক ফ্রেইলিচ সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কথা বলেছেন। তাঁর মতে, কেবল নিজেদের কারখানায় বোমার উৎপাদন বাড়িয়ে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমানো যাবে না, কারণ সেই বোমা ফেলার জন্য বিমানগুলো আমেরিকার কাছ থেকেই আনতে হয়। তিনি আশির দশকের উদাহরণ টেনে বলেন, ইসরায়েল একবার নিজস্ব উচ্চ প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান ‘লাভি’ তৈরির চেষ্টা করেছিল, যা দেশের জিডিপির প্রায় ১৮ শতাংশ গিলে খেয়ে পুরো অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। সীমিত সম্পদের একটি ছোট দেশের পক্ষে একা বিপুল অর্থ খরচ করে উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করা অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব। এমনকি তাদের নিজস্ব মেরকাভা ট্যাংক বা উন্নত আর্টিলারি সিস্টেমের ইঞ্জিন ও ট্রান্সমিশনও আসে মার্কিন অর্থায়ন থেকে। দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আইডিএফের সাবেক উপপ্রধান মেজর জেনারেল (অব.) উজি দয়ান সতর্ক করে বলেন, ‘যেকোনো ব্যয়বহুল অস্ত্র তৈরি করা আমাদের জন্য বেশ কঠিন। অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা আমাদের বুঝতে হবে।’ তবে ইসরায়েলের একমাত্র ব্যতিক্রম তাদের ‘নিজস্ব কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র’। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল এই জায়গাতেই ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাদের পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ‘জেরিকো-৩’ ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এবং ক্রুজ মিসাইল বহনে সক্ষম ‘ডলফিন-класс’ সাবমেরিনগুলো জার্মানি থেকে সংগৃহীত।

ইসরায়েলকে সাহায্য করে যুক্তরাষ্ট্রের কী লাভ?

টাইম ম্যাগাজিনের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত তারা ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মার্কিন সামরিক সহায়তা পেয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে ওয়াশিংটন প্রতিবছর জেরুজালেমকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার দিয়ে আসছে, যার বেশির ভাগই ইসরায়েলের সামরিক ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয়। এই অর্থায়ন মূলত ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং (এফএমএফ) নামক একটি প্রোগ্রামের আওতায় দেওয়া হয়, যা অংশীদার দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সামরিক সরঞ্জাম কেনার অনুমতি দেয়।

তবে এই সম্পর্কটি একতরফা নয়, ওয়াশিংটনও এর থেকে অনেক বাণিজ্যিক সুবিধা পায়। সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জন স্পেনসার তাঁর একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, এফএমএফের মাধ্যমে ইসরায়েল যে তহবিল পায়, তার প্রায় ৭৪ শতাংশ অর্থই তারা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সরঞ্জাম কেনার পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য। স্পেনসার ব্যাখ্যা করেন, ইসরায়েলকে দেওয়া এই অর্থ আসলে আমেরিকার অর্থনীতি থেকে বাইরে যায় না; এটি মার্কিন কারখানা, মার্কিন সরবরাহ শৃঙ্খল এবং মার্কিন শ্রমিকদের মধ্যেই আবর্তিত হয়। বাস্তবে অনেকেই যেটিকে বৈদেশিক সাহায্য হিসেবে বর্ণনা করেন, তার বড় অংশ সরাসরি মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানির কাছেই চলে যায়।

এফএমএফের সহায়তার বাইরে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কোস্ট অব ওয়ার’ প্রজেক্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে আরও ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং লেবাননে ইসরায়েলের স্থল অভিযানের পেছনে হওয়া খরচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ২০২৩ সালে মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে ইসরায়েলের মোট প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ আসত মার্কিন সাহায্য থেকে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে এই মার্কিন সহায়তার পরিমাণ কেবল বেড়েই চলেছে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, মার্কিন সেনারা সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও ইসরায়েলের মাধ্যমে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং ড্রোন যুদ্ধের লাইভ শিক্ষা লাভ করে। এ ছাড়া মোসাদের মতো ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে পাওয়া তথ্য মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে। তাই ইসরায়েলি নেতারা মুখে যতই স্বাধীনভাবে বা একলা চলার বার্তা দিন না কেন, মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তার লাইফলাইন ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকা বা শত্রুদের হাত থেকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করা কার্যত অসম্ভব। অর্থাৎ শুরুতে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর তাহলে এককথায় দাঁড়ায়, না। ওয়াশিংটনের সমর্থন ছাড়া জেরুজালেমের পক্ষে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে


এ জাতীয় আরো খবর...