স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন কোনো সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রতীকী একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেই সিদ্ধান্তটি হলো—রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি প্রথম কোন দেশে নিজের আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর শুরু করবেন। ঐতিহ্যগতভাবেই এই সিদ্ধান্তটি কেবল একটি সাধারণ ভ্রমণ বা দ্বিপক্ষীয় সাক্ষাৎকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি নতুন প্রশাসনের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী বার্তা বহন করে। অতীতে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানেরা প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতকে বেছে নিয়েছেন। আবার কখনো আঞ্চলিক পরাশক্তি চীন কিংবা নিরপেক্ষ ও বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরকে প্রধান গন্তব্য করা হয়েছে। এর বাইরে ধর্মীয় অনুভূতির মেলবন্ধন ও অর্থনৈতিক কারণে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবকেও অনেকে প্রথম সফরের তালিকায় রেখেছেন, যা এক অর্থে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি ওমরাহ পালনের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতীকী বার্তা দেয়। ঠিক যেমনটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনের আগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা হযরত শাহজালালের (র.) মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে সিলেট থেকে তাঁদের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও পটুপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগ্রসর দেশ মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন, যা এক নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নির্বাচিত সরকারপ্রধানের এই প্রথম আন্তর্জাতিক সফরটি তাঁর নতুন সরকারের ভূ-রাজনৈতিক অগ্রাধিকার যেমন প্রকাশ করে, ঠিক তেমনি অংশীদার রাষ্ট্রগুলোকে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি কৌশলগত সমীকরণগুলোকে আরও জোরদার করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক কূটনীতিতে ভারত এবং চীন—উভয় রাষ্ট্রই অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অবিকল্প অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিগত সরকারের লম্বা শাসন আমলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। যদিও সেই সরকারের শেষ সময়ে এসে তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেইজিংয়ের সাথেও সম্পর্কের একটি মাপা ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচ্ছন্ন চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই সরকারের আকস্মিক পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো মেয়াদে ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পারদ এক অভূতপূর্ব তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ঠিক সেই ক্রান্তিকালে চীন অত্যন্ত চতুরতার সাথে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের পাশাপাশি এদেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তাদের বহুমাত্রিক কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পর্ককে নতুন করে ঝালাই করতে অত্যন্ত মনোযোগী হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এসে যখন দেশের মূল ধারার একটি রাজনৈতিক দলের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা ক্রমান্বয়ে জোরালো হচ্ছিল, তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতও বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশের হবু নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এদেশের এক শীর্ষস্থানীয় নারী নেত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার বার্তা দিতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রীও শোকবার্তা পাঠিয়ে নবগঠিত রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বের সাথে নতুন করে দ্বিপক্ষীয় সেতুবন্ধন তৈরির একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যখন দেশে সম্পূর্ণ নতুন সরকার গঠিত হয়, তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকা সফরে আসেন ভারতের লোকসভার স্পিকার। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র তুলে দেন, যেখানে সুবিধাজনক সময়ে দ্রুত ভারত সফরের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
এরই মাত্র কয়েকদিন পর, অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিং সফরের একটি জোরালো আমন্ত্রণ জানান। মে মাসে চীনের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও বেইজিং সফরের আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়, যার ফলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে যে নতুন সরকারপ্রধান হয়তো প্রথম সফরে চীনেই যাচ্ছেন। তবে এই সমস্ত সমীকরণের মাঝেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী টেলিফোনে তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান এবং কুয়ালালামপুর সফরের প্রাথমিক আমন্ত্রণ দেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করলে সেই সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ নেয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক রাজনীতির দুই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড় ভারত ও চীনের মধ্যকার তীব্র ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চাপ এড়িয়ে নিখুঁত কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য একটি নিরপেক্ষ ‘তৃতীয় দেশ’ বেছে নিতে হতো। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে দেশের সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব স্পষ্ট ছিল। এমতাবস্থায় নতুন প্রধানমন্ত্রী যদি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রথম সফরের জন্য নয়া দিল্লিকে বেছে নিতেন, তবে অভ্যন্তরীণ সমালোচকেরা সেটিকে ‘দিল্লিমুখী দাসত্বমূলক পররাষ্ট্রনীতি’ হিসেবে প্রচার করার একটি রাজনৈতিক সুযোগ পেয়ে যেতেন। আবার বিপরীতভাবে, তিনি যদি প্রথম সফরে বেইজিংয়ে পা রাখতেন, তবে আন্তর্জাতিক মহলে বার্তা যেত যে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যা ভারতকে ক্ষুব্ধ ও কৌশলগতভাবে আশঙ্কিত করে তুলতে পারত। এই অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে অপ্রয়োজনীয় দ্বিপক্ষীয় বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনা এড়াতেই মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির পক্ষে না গিয়ে সবার সাথে সমান দূরত্বের ভারসাম্যপূর্ণ ও বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার এই সুদূরপ্রসারী কৌশল ছাড়াও, মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার পেছনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ ও অর্থনৈতিক সমীকরণ কাজ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মুসলিম বিশ্বের অগ্রসর ও মধ্যপন্থী নেতৃত্বের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অবস্থান তৈরি করা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের পেছনে তাঁর বাবার ঐতিহাসিক কূটনৈতিক দর্শনের এক বিরাট প্রভাব রয়েছে। সত্তরের দশকের শেষভাগে যখন তাঁর বাবা দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, তখন তিনি অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে এক অনন্য ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি জনশক্তির জন্য এক বিশাল কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও সেই একই পথ অনুসরণ করে মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চান।
তাছাড়া, বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার মূল চালিকাশক্তি হলেন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। কিন্তু নানা অনিয়ম ও ভিসা জটিলতার কারণে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়ার দুয়ার বেশ কয়েক বছর ধরেই বন্ধ রয়েছে। এই বন্ধ বাজারটি পুনরায় সচল করা এবং সেখানে অবস্থানরত অনিয়মিত হয়ে পড়া হাজার হাজার বাংলাদেশিকে বৈধভাবে থাকার সুযোগ করে দিতে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে একটি নতুন কাঠামোগত চুক্তির বড্ড প্রয়োজন ছিল। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে নতুন কর্মী নিয়োগ, ভিসা সহজীকরণ, কর্মীদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের মতো নতুন অর্থনৈতিক খাতে কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়গুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এছাড়া, মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ বা পূর্ণাঙ্গ সদস্য হওয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সফরে মালয়েশিয়ার সমর্থন আদায় করতে পারলে তা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক দেশগুলোর মধ্যে একটি সোনালী সেতুবন্ধন তৈরি করবে।
রোববার স্থানীয় সময় রাতে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সহধর্মিণীকে নিয়ে কুয়ালালামপুরে পৌঁছাবেন এবং এই সফরে দুই দেশের মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার কথা রয়েছে। তবে কুয়ালালামপুরে এই বিতর্কহীন সফর শেষ করেই প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন, যা এই সফরের দ্বিতীয় অংশ। বেইজিংয়ে তাঁর এই সফরে প্রায় ১৫ থেকে ১৭টি মেগা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্প, দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং চীনের বৈশ্বিক অবকাঠামোগত উদ্যোগে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়গুলো নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে চূড়ান্ত আলোচনা হবে।
এই ঐতিহাসিক সফরের পেছনে কূটনৈতিক কৌশলের পাশাপাশি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর একটি দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত আবেগ ও গভীর আগ্রহের ইতিহাসও মিশে রয়েছে। প্রায় দুই যুগ আগে, অর্থাৎ ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া তাঁর জীবনের প্রথম দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে স্বীকার করেছিলেন যে, বাংলাদেশের বাইরে তাঁর সবচেয়ে পছন্দের দেশ হলো মালয়েশিয়া। তিনি সুযোগ পেলেই দেশটিতে যেতেন এবং সেখানকার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জাদু নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করতেন। তিনি সেই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, এক সময় মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশের মতোই ছিল, কিন্তু মাত্র ১৫-২০ বছরের ব্যবধানে তারা নিজেদের সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছে। যেহেতু মালয়েশিয়ার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বাংলাদেশের অনেক মিল রয়েছে, তাই তারা যেভাবে নিজেদের উন্নয়ন করেছে, ঠিক সেই মডেলে তিনি বাংলাদেশকেও একটি উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে আগ্রহী। এর বাইরে আরও একটি বড় ব্যক্তিগত বেদনা ও আবেগ এই দেশের সাথে জড়িয়ে আছে; ২০১৫ সালে যখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন, তখন তাঁর একমাত্র ছোট ভাই মালয়েশিয়াতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তখন লন্ডনে অবরুদ্ধ থাকার কারণে শেষবারের মতো নিজের ছোট ভাইকে দেখার বা তাঁর জানাজায় শরিক হওয়ার সুযোগও তিনি পাননি, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পর সরকারপ্রধানদের প্রথম সফরের একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর, ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরে ভারতে যান, যা মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অপরিসীম সাহায্য ও তৎকালীন আন্তর্জাতিক বাস্তবতার নিরিখে ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, ১৯৭৬ সালের শেষভাগে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়ে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে যান, যা বেইজিংয়ের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এর পর ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ওআইসির প্রভাবশালী সদস্য রাষ্ট্র সৌদি আরবকে।
নব্বইয়ের দশকের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে যখন দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়, তখন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে প্রথমে সংক্ষিপ্ত সফরে নয়া দিল্লি যান এবং এর পরপরই দেশের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর বৈশ্বিক সাহায্য সংগ্রহ করতে সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক সফর পরিচালনা করেন। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনাও ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে প্রথমে সৌদি আরব যান এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় সফরে চীন ও ভারত সফর করেন। পরবর্তীতে ২০০১ এবং ২০০৯ সালেও সরকারপ্রধানেরা তাঁদের মেয়াদের প্রথম সফরে সৌদি আরবকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস প্রথা ভেঙে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সফরকে তাঁর প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বর্তমান নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীও সেই ধারাবাহিকতায় কোনো বিতর্কিত প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে বেছে না নিয়ে মালয়েশিয়া ও চীনের এই যৌথ সফরকে বেছে নিলেন, যা আগামী দিনে বাংলাদেশের স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির মূল গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত দূরদর্শী ও যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: বিডিনিউজ২৪