একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নতুন সরকারপ্রধান দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের সিদ্ধান্তটি কেবল সাধারণ কোনো কূটনৈতিক ভ্রমণ নয়। এটি একই সাথে বহন করে গভীর রাজনৈতিক প্রতীক, রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার এবং সেই সময়ের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার স্পষ্ট বার্তা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যতজন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকেই নিজেদের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য নির্বাচনে সমসাময়িক ইতিহাস, আন্তর্জাতিক সমীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক দারুণ প্রতিচ্ছবি রেখে গেছেন।
স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন মেয়াদে বাংলাদেশের শীর্ষ শাসকদের প্রথম বিদেশ সফরের সেই ঐতিহাসিক গতিপথ ও প্রেক্ষাপটের ওপর একটি বিশেষ আলোকপাত নিচে তুলে ধরা হলো।
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও প্রথম সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর শুরু করেন। তাঁর এই উদ্বোধনী সফরের গন্তব্য ছিল নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অকৃত্রিম সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা, এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদান এবং তৎকালীন বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে এই সফরটি ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ও অবধারিত।
কলকাতায় অনুষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক সফরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এক ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য ছিল বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনী বা সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী কূটনীতির ফলেই পরবর্তীতে ১ মার্চ ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় এবং ১৫ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে সমস্ত ভারতীয় সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক ও পটপরিবর্তনকারী রাজনৈতিক ঘটনার পর দেশের শাসনভার ও কূটনীতির গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে যায়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২ থেকে ৫ জানুয়ারি চীনে যান। এটিই ছিল নতুন প্রশাসনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফর, যা বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে।
পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেন এবং সেই বছরই কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাজ্য সফর করেন, যা ছিল বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ফোরামে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর প্রথম পদার্পণ। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারকে (তৎকালীন বার্মা)। ১৯৭৭ সালের ২০ জুলাই তাঁর এই মিয়ানমার সফরটি ছিল মূলত মুসলিম বিশ্বের বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বাংলাদেশের কানেক্টিভিটি বাড়ানোর একটি প্রাথমিক প্রয়াস।
সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলকারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেন মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র সৌদি আরবকে। ১৯৮২ সালের ২ মে সৌদি আরবে সেই সফল সফরের পর ওআইসি ভুক্ত দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদারে মনোযোগ দেন তিনি। পরবর্তীতে একই বছরের অক্টোবর মাসে তিনি প্রতিবেশী দেশ ভারত সফরে যান।
তবে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করার পর এরশাদের প্রথম বিদেশ সফরটি ছিল উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোতে। ১৯৮৪ সালের ১৬ জানুয়ারি মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় অনুষ্ঠিত অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি এই সফর করেন, যা বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহর সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততাকে আরও সুদৃঢ় করেছিল।
নব্বইয়ের দশকের ঐতিহাসিক স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ গণ-আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের মার্চ মাসে দেশে পুনরায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ফিরে আসে এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বেগম খালেদা জিয়া। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ২১ মে ভারতের তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এক ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হলে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও আকস্মিক সফরে নয়া দিল্লি যান তিনি। এটি সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর প্রথম বিদেশ সফর হলেও তা ছিল মূলত একটি আকস্মিক শোক সফর।
এর পরপরই, ২৫ মে প্রথম আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে পৌঁছান। সৌদি আরব থেকে ক্রমান্বয়ে তিনি কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফর করেন। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর লণ্ডভণ্ড বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক পুনর্গঠন সহায়তা ও আর্থিক অনুদান সংগ্রহ করাই ছিল তাঁর এই মধ্যপ্রাচ্য সফরের প্রধান ও মূল লক্ষ্য। পরবর্তীতে ২০০১ সালের অক্টোবরে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় ফেরার পরও খালেদা জিয়ার প্রথম বিদেশ সফর ছিল সৌদি আরবেই, যেখানে তিনি ওমরাহ পালনের পাশাপাশি তৎকালীন সৌদি বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছিলেন।
১৯৯৬ সালের জুনে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর জুলাই মাসে পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে তিনি সৌদি আরবে যান এবং এটিই ছিল তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর। এর পরপরই, সেই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি চীনে যান এবং পরবর্তীতে ডিসেম্বর মাসে ভারতের সাথে ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সই করার লক্ষ্যে নয়া দিল্লি সফর করেন।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় ফেরার পরও শেখ হাসিনা তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে ওমরাহ করার জন্য সৌদি আরবকেই বেছে নেন এবং বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সাক্ষাৎ করেন। তবে ২০১৪ সালে তৃতীয় মেয়াদের দায়িত্ব নিয়ে তিনি মে মাসে চার দিনের সফরে জাপানে যান। এরপর ২০১৯ সালে চতুর্থ মেয়াদে তাঁর প্রথম গন্তব্য ছিল জার্মানি ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এমনকি ২০২৪ সালে পঞ্চম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাঁর উদ্বোধনী বিদেশ সফরটি ছিল জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগদানের মাধ্যমে।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে এক নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের নাটকীয় পতন ঘটে, যার ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পারদ মারাত্মকভাবে নিচে নেমে যায়। এই পরিস্থিতিতে দেশের হাল ধরেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর চিরাচরিত প্রথা ভেঙে প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রে না গিয়ে সেপ্টেম্বর মাসের শেষে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে যান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে।
সেটিই ছিল তাঁর সরকারের প্রথম এবং অত্যন্ত সফল সরকারি সফর, যেখানে তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেন। ক্ষমতা থাকার প্রায় দেড় বছরের মেয়াদে তিনি অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ সফর পরিচালনা করলেও প্রতিবেশী ভারতে তাঁর একবারের জন্যও যাওয়া হয়নি; তবে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তিনি একটি অত্যন্ত হাই-প্রোফাইল দ্বিপক্ষীয় সফরে চীনে গিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাই স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আদর্শের পরিবর্তনের সাথে সাথে রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রথম সফরের মানচিত্রও বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।