সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ১২:৪২ পূর্বাহ্ন

যুক্তরাজ্যের আদালতে হাসনাত আব্দুল্লাহসহ চার নেতার বিরুদ্ধে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সফরে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও মারধরের অভিযোগে এক আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ সংগঠক এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য। দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর লন্ডনে থাকা নিষিদ্ধ দলটির প্রবাস শাখার নেতা-কর্মীরা একজোট হয়ে এনসিপির দক্ষিণ অঞ্চলের প্রধান সমন্বয়ক তথা কুমিল্লা-৪ আসনের বর্তমান আইনপ্রণেতা হাসনাত আব্দুল্লাহসহ চার নেতার বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেছেন। যুক্তরাজ্যের একটি স্থানীয় থানায় প্রবাসে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই আনুষ্ঠানিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মামলায় এজাহারনামীয় অন্য অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন প্রবাসে সক্রিয় এনসিপি নেতা এহতেশাম হক, জাকির চৌধুরী ও শাহিন আলম। এছাড়া, হামলার ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে অজ্ঞাতনামা আরও বেশ কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশিকে এই মামলার আসামি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত এনসিপি প্রবাস শাখার জোট বা ‘এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্স’ গত শনিবার এক বিশেষ বিবৃতির মাধ্যমে দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে প্রবাসে দায়ের হওয়া এই মামলার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব মো. এম এ হিমেল স্বাক্ষরিত ওই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সাবেক ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগের কিছু অতিউৎসাহী কর্মী-সমর্থক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই নতুন আইনি প্রচারণা ও হয়রানি শুরু করেছে। তাদের পক্ষ থেকে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং তাঁর প্রবাস সফরসঙ্গীদের বিরুদ্ধে চলমান ধারাবাহিক অপপ্রচার ও নানামুখী মানসিক হেনস্থার অংশ হিসেবেই এই মামলা করা হয়েছে। প্রবাসে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর চড়াও হওয়ার যে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মূলত ব্রিটিশ পুলিশের মূল্যবান সময় নষ্ট করার একটি অপকৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।

এনসিপি প্রবাস শাখার পক্ষ থেকে দেওয়া ওই বিবৃতিতে আরও একটি বড় ও বিস্ফোরক দাবি করা হয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের আমলে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের প্রবাসে পরিচালিত নানামুখী রাজনৈতিক ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে ইতিমধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। লন্ডনে দলটির সম্ভাব্য উগ্র দলীয় কার্যক্রম, প্রবাসে ব্রিটিশ জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার ওপর এর বিরূপ প্রভাব এবং যুক্তরাজ্যের স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় ইতিমধ্যেই একটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা তাদের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। প্রবাসে দলটির অর্থায়ন এবং আইনি জটিলতা সৃষ্টির প্রবণতাও এই তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, প্রবাসে প্রোপাগান্ডা ও আইনি নোটিশের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। লন্ডনে অবস্থানকালে ব্রিটিশ পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকার জন্য তিনি প্রবাস প্রশাসনের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। এনসিপির দাবি অনুযায়ী, মামলা দিয়ে প্রবাসে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও গণসংযোগ কোনোভাবেই স্তিমিত করা যাবে না, কারণ ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী তারা সম্পূর্ণ বৈধভাবে তাদের সফর পরিচালনা করছেন।

প্রবাসে এনসিপি নেতাদের ওপর আওয়ামী সমর্থকদের ক্ষোভের কারণ হিসেবে তাদের ধারাবাহিক কর্মসূচিকে দেখা হচ্ছে। দলটির পক্ষ থেকে প্রবাসে পাঠানো বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাজ্য সফরের শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা সুপরিকল্পিতভাবে হাসনাত আব্দুল্লাহর বিভিন্ন পাবলিক প্রোগ্রাম ভণ্ডুল করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। বিশেষ করে, বিশ্বখ্যাত ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়ন’-এ বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে তাঁর নির্ধারিত বক্তব্য প্রদানের অনুষ্ঠানটি পণ্ড করতে এবং পুরো যুক্তরাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের সাথে তাঁর পূর্বনির্ধারিত মতবিনিময় সভাগুলোতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দলটির প্রবাস শাখা দফায় দফায় চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে প্রবাসীদের ব্যাপক সমর্থন এবং ব্রিটিশ পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার কারণে তাদের প্রতিটি অপচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

কূটনৈতিক ও প্রবাস সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল হিসেবে দলটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দেশে সীমাবদ্ধ করার পর থেকেই প্রবাসে থাকা আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের আইনি ও লবিং লড়াই শুরু করেছে। তারই অংশ হিসেবে লন্ডনের স্থানীয় রাজনীতি ও আইনকে ব্যবহার করে এনসিপির মতো নতুন রাজনৈতিক শক্তির ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতেই এই মারধরের মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। তবে ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থায় এই ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার সত্যতা যাচাইয়ে কড়া ফরেনসিক ও তথ্যগত প্রমাণের প্রয়োজন হয়, যা শেষ পর্যন্ত মামলাটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এই মামলার ফলে প্রবাসে বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও উত্তেজনা এখন বিদেশের আদালতেও গড়াচ্ছে, যা ব্রিটিশ সমাজে প্রবাসী বাঙালিদের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...