রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর পলায়নের পর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একটি বড় অংশই এখন হয় আত্মগোপনে, না হয় দেশের বাইরে পলাতক। তবে তাঁদের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান অবৈধ সম্পদ রয়ে গেছে দেশের অভ্যন্তরেই। ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা হাজার হাজার কোটি নগদ টাকা থেকে শুরু করে বিলাসবহুল বাড়ি, ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক ভবন ও শত শত একর জমি—সব মিলিয়ে এই সম্পদের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসানের পর এসব অঢেল অর্থ ও সম্পত্তি আদালতের নির্দেশে ক্রোক ও ফ্রিজ করা হলেও, তার সুফল এখনো সাধারণ জনগণের বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ভাগে জোটেনি। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, রিসিভার বা তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগে ধীরগতি এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার চরম দুর্বলতার কারণে জব্দ করা এই বিশাল সম্পত্তির প্রায় ৮০ শতাংশই এখনো সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত সরকারের পতন ও বিভিন্ন মামলার পর আদালতের পক্ষ থেকে একের পর এক সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। উদাহরণস্বরূপ, রাজধানীর গুলশান-২ এলাকার ৭১ নম্বর সড়কে অবস্থিত ‘ইস্টার্ন হারমোনি’ ভবনের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্নি ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। ২০২৫ সালেই বিজ্ঞ আদালত এই ফ্ল্যাটটি জব্দের চূড়ান্ত আদেশ দিলেও সেখানে আজ পর্যন্ত কোনো সরকারি রিসিভার নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে, সেগুনবাগিচায় শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার নামে বেনামে থাকা আরেকটি ফ্ল্যাট জব্দের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে বুঝে নিতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আদালতের আদেশের পরও এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার কারণে অভিযুক্তদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাই এখনো বহাল তবিয়তে এসব সম্পদ ভোগদখল করছে।
নথিপত্র ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, আদালতের নির্দেশনায় এ পর্যন্ত দেশ-বিদেশে মোট যে ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ফ্রিজ বা ক্রোক করা হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্পদই রয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এর মধ্যে কেবল স্থাবর সম্পত্তির (জমি ও ভবন) আর্থিক মূল্যই প্রায় ছয় হাজার ১৩৭ কোটি টাকার বেশি, যা বিভিন্ন সময়ে ক্রোকের আদেশ পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
তবে এই বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির সিংহভাগের ক্ষেত্রেই আইন অনুযায়ী কোনো তত্ত্বাবধায়ক বা রিসিভার নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়নি। ফাইল চালাচালি আর আইনি মারপ্যাঁচের কারণে পুরো বিষয়টি মাঝপথে ঝুলে রয়েছে। ফলস্বরূপ, শেখ হাসিনার পরিবার, বিতর্কিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের শীর্ষ সুবিধাভোগীদের সম্পত্তিগুলো হাতবদল না হলেও, সেগুলোর অভ্যন্তরীণ আয় ও সুবিধা এখনো পরোক্ষভাবে তাঁদের পকেটেই যাচ্ছে।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (আইন অনুবিভাগ) মো. মঈদুল ইসলাম এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, অপরাধলব্ধ সম্পদ জব্দ করার পর তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিয়ে আসা বা তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে দুদকের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার এক বিরাট ঘাটতি স্পষ্ট। এই প্রাতিষ্ঠানিক আন্তরিকতার অভাবই মূলত আশি শতাংশ সম্পদ হাতছাড়া থাকার প্রধান কারণ। আইন অনুযায়ী, ক্রোককৃত যেকোনো সম্পত্তি থেকে অর্জিত মাসিক বা বাৎসরিক আয় সরাসরি রাষ্ট্রীয় রিসিভারের অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু দুদক যদি সময়মতো আদালতে আবেদন করে সেই সম্পত্তির দখল ও তদারকির দায়িত্ব নিজের নিয়ন্ত্রণে না নেয়, তবে প্রকারান্তরে আসামিরাই সেই অবৈধ সম্পদ ভোগ করতে থাকে। চূড়ান্ত রায়ের পর এই বিপুল অর্থ যেন সহজেই রাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করতে পারে এবং অন্তর্বর্তী সময়ে সম্পদগুলো যাতে নষ্ট বা বেদখল না হয়, সেজন্যই মূলত আদালত রিসিভার নিয়োগের আদেশ দেন। রিসিভারদের দায়িত্ব হলো সম্পত্তির আয়-ব্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিয়মিত আদালতে পেশ করা। যদি সঠিক সময়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করা হয়, তবে রাষ্ট্রের যেমন কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়, তেমনি পুরো জবাবদিহিতা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও রিসিভার নিয়োগের এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন দুদকের কর্মকর্তারাও। দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, যেকোনো ব্যক্তির সম্পদ অবরুদ্ধ বা ক্রোক করতে হলে সবার আগে সুনির্দিষ্ট আইনি তথ্য-প্রমাণ সহকারে আদালতের আদেশের প্রয়োজন হয়। সেই আদেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানকারী বা তদন্ত কর্মকর্তা রিসিভার নিয়োগের জন্য আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেন। এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে নথিপত্র সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বাড়তি সময় লেগে যায়। তবে কমিশনের কর্মকর্তারা তাঁদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, দুদকের প্যানেল আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম জনবল সংকটের বিষয়টি সামনে এনে বলেন, শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির নথিপত্র সংগ্রহ করা এবং বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেল ও ভূমি দপ্তরে অনুসন্ধান চালানো একটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কাজ। দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার ইচ্ছা থাকলেও পর্যাপ্ত কর্মকর্তা ও লোকবল না থাকায় অনেক সময়ই ক্রোক করা সম্পদ সময়মতো বুঝে নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে এর মধ্যেও সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদসহ দেশের হাতেগোনা কয়েকজন শীর্ষ প্রভাবশালীর ক্রোককৃত সম্পদে রিসিভার নিয়োগ করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ জমা করার প্রক্রিয়া সফলভাবে শুরু করা গেছে বলে দুদক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, অপরাধলব্ধ সম্পদ অবরুদ্ধ বা ক্রোক করার পর আদালতের মাধ্যমে নিয়োগকৃত রিসিভারদের (যেমন—সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক বা অন্যান্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ) কাজের ওপর সার্বক্ষণিক তদারকি ও নজরদারি করার মূল দায়িত্বটি দুদকের ‘সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের’ ওপর ন্যস্ত। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ও শত শত রিসিভারকে তদারকি করার জন্য দুদকের এই বিশেষ ইউনিটে কর্মকর্তা আছেন মাত্র ৬ জন! একজন পরিচালক, চারজন উপপরিচালক ও একজন সহকারী পরিচালকের সমন্বয়ে গঠিত এই ক্ষুদ্র দলের পক্ষে সমগ্র বাংলাদেশের ক্রোককৃত সম্পত্তির ওপর কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নজরদারি চালানো সম্পূর্ণ অসম্ভব। আর এই প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই অনেক জেলার রিসিভাররা তাঁদের অর্পিত দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করছেন, যার সুফল যাচ্ছে মূল অপরাধীদের পক্ষে।
অস্থাবর বা তরল সম্পদের ক্ষেত্রে দুদক কিছুটা অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং তাঁদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন দাতব্য ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মোট ১৫৬টি ব্যাংক হিসাব এরই মধ্যে অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করা হয়েছে, যেখানে জমা রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৫ কোটি নগদ টাকা। তথ্য অনুযায়ী, জব্দ হওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংকের তহবিল রয়েছে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের’ নামে। এর বাইরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সূচনা ফাউন্ডেশন, সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) এবং আবু সিদ্দিক মেমোরিয়াল ট্রাস্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতেও কোটি কোটি টাকা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
জব্দকৃত ব্যাংক হিসাবের তালিকায় শেখ হাসিনা ছাড়াও রয়েছেন তাঁর বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, ববির বাবা শফিক আহমেদ সিদ্দিক, শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিক, তারেকের স্ত্রী শাহীন সিদ্দিক এবং কন্যা বুশরা সিদ্দিক।
দুর্নীতির অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে, ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সরকারের ৯টি মেগা প্রকল্পে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত ও লোপাটের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে দুদক। এর ঠিক পাঁচ দিন পর, অর্থাৎ ২২ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে ৩০ কোটি ডলার পাচারের অভিযোগে হাসিনা ও জয়ের বিরুদ্ধে আরেকটি পৃথক মানি লন্ডারিং মামলার অনুসন্ধান শুরু হয়। এছাড়া, রাজউকের পূর্বাচল নিউ টাউন প্রজেক্টে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে করা ছয়টি সুনির্দিষ্ট মামলায় গত বছরের ১০ মার্চ শেখ হাসিনা, শেখ রেহানাসহ তাঁদের পরিবারের মোট ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করেছে রাষ্ট্রীয় এই দুর্নীতি দমন সংস্থা। তবে এই আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ক্রোককৃত দৃশ্যমান স্থাবর সম্পদগুলোকে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় শতভাগ নিয়ন্ত্রণে এনে সেগুলোর ব্যবস্থাপনায় গতি আনা না গেলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের চলমান লড়াইয়ের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে বলে মনে করছেন দেশের আইন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: কালের কন্ঠ