বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১২:০৪ পূর্বাহ্ন

গ্রামাঞ্চলেও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

এক সময়ের ‘শহুরে রোগ’ হিসেবে পরিচিত ডেঙ্গু এখন আর কেবল ঢাকা বা বড় শহরের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। ভাইরাসজনিত এই রোগটি বর্তমানে গ্রাম-বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশই ঢাকার বাইরের, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্য অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত এবং এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা কার্যকর ব্যবস্থা নেই, সেখানে এই রোগের বিস্তার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৫ হাজার ১৬০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৩০ জন অর্থাৎ প্রায় ৭৮ শতাংশ রোগীই ঢাকার বাইরে থেকে আসা। অথচ ২০২৩ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৯০ শতাংশই ছিল ঢাকা মহানগরী কেন্দ্রিক। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এই চিত্র পুরোপুরি উল্টে গেছে। বিশেষ করে বরিশাল বিভাগ বর্তমানে ডেঙ্গুর নতুন হটস্পটে পরিণত হয়েছে, যেখানে গত কয়েক দিনে ১ হাজার ৩৮৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ঝালকাঠির মতো জেলাগুলো থেকেও আশঙ্কাজনক হারে রোগী ভর্তির খবর আসছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৩ সালের পবিত্র ঈদুল আজহার সময় রাজধানী থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নিজ গ্রামে ফেরার কারণেই ডেঙ্গুর জীবাণু সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর থেকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে গ্রামের পরিবেশ আর আগের মতো নেই। রাস্তাঘাট, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, আবাসন প্রকল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ফলে সেখানে অসংখ্য কৃত্রিম জলাধার তৈরি হয়েছে, যা এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া গ্রামের পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর ডেঙ্গু দমনের মতো কোনো অবকাঠামো বা অভিজ্ঞতা নেই।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, গ্রামের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো দশকের পর দশক ধরে কেবল কিউলেক্স মশা দমনে অভ্যস্ত। কিন্তু কিউলেক্স ও এডিস মশা দমনের কৌশল সম্পূর্ণ আলাদা। কিউলেক্স মশা সাধারণত ড্রেন বা নোংরা পানিতে জন্মায়, অন্যদিকে এডিস মশা জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। ফলে এডিস মশা দমনে ব্যবহৃত ওষুধ বা পদ্ধতি গ্রামের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে এখনো অনেকটাই অজানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী সতর্ক করে বলেন, “গ্রামাঞ্চল ডেঙ্গু মোকাবিলায় মোটেও প্রস্তুত নয়। যদি এখনই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা না হয়, তবে আগামী বছরগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ রূপ প্রথম দৃশ্যমান হয় ২০২৩ সালে, যখন ৩ লাখ ২১ হাজার রোগী আক্রান্ত এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই সংখ্যাটি ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মোট মৃত্যুর দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৪ সালে ৫ ৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জনের মৃত্যুর পর চলতি বছরও পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। জুন মাস শেষ হওয়ার আগেই এ মাসের ভর্তি রোগীর সংখ্যা বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় ৪০ শতাংশ।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ‘মশা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক জাতীয় কমিটি’র সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় মশা নিধনে সারা দেশে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই সাথে কীটনাশকের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে কেবল টাস্কফোর্স গঠনই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন এপিডেমিওলজিস্টরা। তাদের মতে, গ্রামাঞ্চলকে ডেঙ্গুর বিস্তার থেকে রক্ষা করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। ইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক ডা. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেনের মতে, কেবল শহরকেন্দ্রিক চিন্তা বাদ দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত করতে হবে। সেই সাথে ভাইরাস সার্ভিল্যান্স ও ল্যাব সুবিধা উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত ও আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হয়, তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অদূর ভবিষ্যতে এক বড় মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


এ জাতীয় আরো খবর...