যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার ফসল হিসেবে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও, এর ভাষাগত অস্পষ্টতা এখন শান্তি প্রচেষ্টার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে করা এই চুক্তিতে এমন কিছু শব্দ বা পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। ফলে দুই দেশই তাদের নিজস্ব সুবিধামতো চুক্তির ব্যাখ্যা দিচ্ছে, যা হরমুজ প্রণালির মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে উত্তেজনাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, চুক্তিতে ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’ ও ‘নিরাপদ যাতায়াত’-এর মতো আপেক্ষিক শব্দ ব্যবহারের কারণে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত দুই সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই মাঠপর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার একটি কনটেইনার জাহাজে ইরানের হামলার ঘটনা এবং তার জবাবে শুক্রবার মার্কিন বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনায় পাল্টা হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধবিরতি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
মূল সমস্যাটি জড়িয়ে আছে হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে। ইরান দাবি করছে, প্রণালির মূল নৌপথ তাদের জলসীমার অন্তর্ভুক্ত, তাই তারা এই পথ ব্যবহারের ওপর শর্ত জুড়ে দিতে চায়। অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক এই জলপথকে ‘টোলমুক্ত’ ঘোষণা করে ইরানের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইরান একে ‘সার্ভিস ফি’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলেও যুক্তরাষ্ট্র তাকে অবৈধ হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। চুক্তির নমনীয় ভাষা তেহরানকে সুযোগ করে দিয়েছে একে একটি ‘কৌশলগত বিরতি’ হিসেবে বিবেচনা করার, যার আড়ালে তারা নিজেদের সামরিক অবস্থান মজবুত করছে।
উত্তেজনা প্রশমনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামরিক হটলাইন চালুর দাবি করলেও ইরান তা সরাসরি অস্বীকার করেছে। উল্টো, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং অনাস্থার পরিবেশে চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার আবর্তে।
বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি প্রতিষ্ঠার তাড়াহুড়োয় চুক্তিতে যে অস্পষ্টতা রাখা হয়েছিল, তা আজ বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুক্তির প্রতিটি ধারা যদি শুরুতেই স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট থাকতো, তবে সম্ভবত আজকের এই সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। এখন দুই দেশই চুক্তির ব্যাখ্যা নিয়ে দড়ি টানাটানি করছে, আর তার খেসারত দিচ্ছে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা। হরমুজ প্রণালির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে এই অস্থিরতা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কই নয়, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে। দ্রুত কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা তৃতীয় কোনো পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়া এই জটিল সংকটের সমাধান হওয়া প্রায় অসম্ভব।