সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১২:৪২ পূর্বাহ্ন

আসছে নতুন মুসলিম সামরিক জোট!

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৮ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ে থাকা আরব রাষ্ট্রগুলো এখন ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো গড়ার পথে হাঁটছে। পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ‘ডন’-এ প্রকাশিত এক বিস্ফোরক কলামে দাবি করা হয়েছে, এখন সময় এসেছে ওআইসি-র মতো অকার্যকর ফোরামের গণ্ডি পেরিয়ে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর মুসলিম সামরিক জোট গঠনের। পাকিস্তান, ইরান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিশরকে নিয়ে এই নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফ্রন্ট বা ঐক্যবদ্ধ জোট গঠনের বিষয়টি এখন আর কল্পনা নয়, বরং সময়ের প্রয়োজনে বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে।

নিরাপত্তা ঘাটতি ও মার্কিন ব্যর্থতা

এই বড় ধরনের পরিবর্তনের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ইরান ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাত। এতদিন আরব দেশগুলো মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে নিজেদের নিরাপত্তার প্রধান ঢাল মনে করত। কিন্তু ইরান যখন উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, তখন এক নতুন ও উদ্বেগজনক সত্য উন্মোচিত হয়। আরব দেশগুলো বুঝতে পারে, মার্কিন বাহিনী নিজেই এখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। এছাড়া যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সরাসরি ইসরায়েলকে সরবরাহ করে, যা সৌদি আরব বা কুয়েতের মতো দেশগুলোকে আংশিক অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে দেয়। এই নিরাপত্তা ঘাটতি ও মার্কিন প্রশাসনের প্রতি আস্থার সংকটই আরব বিশ্বকে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

আর-ফোর বা রিজিওনাল ফোর জোটের নেপথ্যে

নিরাপত্তা এই সংকট মোকাবিলায় নিঃশব্দে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘আর-ফোর’ (R-4) বা রিজিওনাল ফোর জোট। পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিশরকে নিয়ে গঠিত এই জোট ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার অত্যন্ত গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছে। এই নতুন জোটের নেপথ্য কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। তিনি কেবল পর্দার আড়ালে নয়, বরং সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন। যুদ্ধ চলাকালীন তিনি অন্তত দুবার ইরান সফর করেছেন, যা তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা দূর করার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক। এছাড়াও লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ও তুরস্কের স্থলবাহিনীর কমান্ডারের পাকিস্তান সফর এই জোটের সামরিক কাঠামোর ভিতকে শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দেয়। সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এই নতুন মুসলিম জোটের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করছে।

আদর্শিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ

গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অব্যাহত নৃশংসতা, লেবাননে আগ্রাসন এবং ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার আদর্শিক লক্ষ্য আরব দেশগুলোর চোখ খুলে দিয়েছে। মুসলিম দেশগুলো এখন স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ বা সংযত করতে ব্যর্থ। ট্রাম্প আমলের ‘আব্রাহাম চুক্তি’র মাধ্যমে ইসরায়েলের সাথে শান্তি স্থাপনের যে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তা আজ পুরো অঞ্চলের ভারসাম্যতা নষ্ট করে দিয়েছে। রিয়াদ থেকে তেহরান—উভয় পক্ষই এখন একমত যে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংকটের মূল উৎস ইসরায়েল রাষ্ট্র। ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজিসকিয়ানের পাকিস্তান সফর এবং ঐক্যবদ্ধ মুসলিম ফ্রন্ট গঠনের আহ্বান এই নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রথম প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ।

জোটের বিস্তার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাবিত জোটে প্রাথমিকভাবে পাকিস্তান, ইরান, তুরস্ক এবং জিসিসিভুক্ত দেশগুলো (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার) ও মিশর অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পরবর্তীতে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও জর্ডানের মতো দেশগুলোকেও এই কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এই জোট যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা হবে বৈশ্বিক রাজনীতির ইতিহাসে একটি বিশাল ‘প্যারাডাইম শিফট’। এটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেবে না, বরং বিশ্বশক্তির ভারসাম্যেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা

এই জোট গঠন করা মোটেও সহজসাধ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ইসরায়েল এবং ভারত—এমন একটি সামরিক জোটের বিরুদ্ধে তাদের তীব্র বিরোধিতা ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে গত নয় মাসের সংঘাতের অভিজ্ঞতা এবং ইরান-সৌদি আরবের নতুন সম্পর্কের রসায়ন প্রমাণ করেছে যে, আঞ্চলিক দেশগুলো চাইলে অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে। পাকিস্তানের সাথে জিসিসি দেশগুলোর স্থিতিশীল সম্পর্ক এই জোটের জন্য একটি বড় রক্ষাকবচ।

নিবন্ধের লেখক যথার্থই বলেছেন, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারই শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ওআইসি-র মতো কেবল কাগজে-কলমে থাকা সংগঠনের চেয়ে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর একটি সামরিক জোটই এখন সময়ের দাবি। নিজেদের মধ্যে শত মতভেদ ও অতীত তিক্ততা ভুলে যদি এই দেশগুলো এক হতে পারে, তবে তা কেবল তাদের নিজেদের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বরং ফিলিস্তিনের মতো দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের সমাধানেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলা করে এই জোট নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে কি না, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো বিশ্ব। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, আরব ও মুসলিম দেশগুলো আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইশারায় চলতে রাজি নয়। তারা এখন নিজস্ব নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষায় এক নতুন যুগের সূচনা করতে প্রস্তুত।

 

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...