রাজধানীর উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পগুলো যখন দখল ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কবলে পড়ে, তখন উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কেবল স্বপ্নই থেকে যায়। এমনই এক হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে পুরান ঢাকার ধোলাইখালে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বাস্তবায়নাধীন একটি পাবলিক টয়লেট দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ‘স্বেচ্ছাসেবক দল’-এর কার্যালয়। উন্নয়ন প্রকল্পের স্থাপনা রাজনৈতিক দলের দখলে যাওয়ার এই ঘটনা জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ধোলাইখাল জলাধারটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, দখল ও দূষণের কারণে রাজধানীর অন্যতম ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল। এই পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে জলাধারটিকে উদ্ধার করে একটি আধুনিক নগর-অবকাশ কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে ২০২৩ সালে ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’-এর আওতায় সংস্কারকাজ হাতে নেয় ডিএসসিসি। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল জলাধারটিকে ঘিরে হাঁটার পথ, সাইকেল ট্র্যাক, সবুজায়ন, উন্মুক্ত মঞ্চ, ঝরনা ও শিশুদের খেলার জায়গাসহ একটি নান্দনিক বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করা। তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এই প্রকল্প উদ্বোধনের সময় একে ‘হাতিরঝিলের চেয়েও দৃষ্টিনন্দন’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ২২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির নকশা অনুযায়ী, ধোলাইখাল এলাকায় দুটি পাবলিক টয়লেট বা গণ শৌচাগার নির্মাণের কথা ছিল। এর মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে নির্মিত টয়লেট ভবনের মূল অবকাঠামো নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ভবনটির দেয়ালে এখন আর স্বাস্থ্যসেবা বা নাগরিক সুবিধার চিহ্ন নেই, বরং সেখানে শোভা পাচ্ছে ‘ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দল ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড প্রধান কার্যালয়’-এর ব্যানার। সরেজমিনে দেখা যায়, কার্যালয়ের ভেতরে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের নির্বাচনী প্রচারণার পোস্টার ও ব্যানার ঝোলানো। সেখানে ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. সুমন হোসেন ও সদস্যসচিব মো. পায়েল শেখের ছবি সংবলিত ব্যানার টানিয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের নথি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চারু এন্টারপ্রাইজ ও মাসুদ হাইটেক এন্টারপ্রাইজের বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনো অনেক কাজ বাকি। গত মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জিত হয়নি। অথচ এই সময়ের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১৬ কোটি ৬০ লাখ টাকারও বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। প্রকল্পের নকশাগত ত্রুটি সংশোধনের নামে ডিএসসিসি সম্প্রতি আরও প্রায় ৬ কোটি টাকার একটি নতুন প্যাকেজ অনুমোদন করেছে, যার কাজ এখনো শুরু হয়নি। প্রকল্পের অন্যান্য কাজের মধ্যে প্রায় ৬০০ মিটার সড়ক, ২০টি বেঞ্চ স্থাপন এবং সবুজায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান চারু এন্টারপ্রাইজের সাইট ইঞ্জিনিয়ার মেহেদী হাসান জানান, টয়লেট ভবনের অবকাঠামোগত কাজ শেষ হলেও ফিনিশিংয়ের বাকি কাজ রাজনৈতিক দখলে থাকার কারণে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকেই ভবনটি রাজনৈতিক দলের দখলে চলে যায়। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা রিয়াজুল কবির বিষয়টিকে ‘সাময়িক ব্যবহার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার দাবি, কারিগরি ত্রুটির কারণে কাজ বন্ধ থাকার সময় স্থানীয় কিছু লোক সেখানে বসতে শুরু করেছিল, কিন্তু নতুন প্যাকেজের কাজ শুরু হলে তারা জায়গা ছেড়ে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে, ডিএসসিসি’র প্রকল্প পরিচালক রাজীব খাদেম জানিয়েছেন, বিষয়টি দাপ্তরিকভাবে এস্টেট বিভাগকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে এবং তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবেন।
দখলের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সূত্রাপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাজিম জানান, স্থানটি আগে ‘স্বেচ্ছাসেবক লীগের’ ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং সেখানে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও মাদক ব্যবসা চলত। বর্তমানে নিজেদের কোনো নিজস্ব কার্যালয় না থাকায় দলের পরামর্শেই তারা আপাতত সেখানে বসছেন এবং প্রকল্পের কাজ শুরু হলে তারা সরে যাবেন। তবে রাজনৈতিক দলের এমন দখলদারিত্বকে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম অবমাননাকর বলে মনে করছেন। তাদের মতে, সরকারি বা উন্নয়ন প্রকল্পের স্থাপনা যদি রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে ভবিষ্যতে তা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী থাকবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল জনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু স্থাপনাটি রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই এখন ব্যাহত হচ্ছে। গণশৌচাগার নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল পথচারী ও এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা। সেখানে রাজনৈতিক ব্যানার ঝোলানো এবং দলীয় কার্যালয় হিসেবে ভবনটি দখল করে রাখায় সাধারণ নাগরিকরা সেখানে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। এটি কেবল জনসেবার পরিপন্থীই নয়, বরং সরকারি সম্পদ তছরুপের শামিল।
উন্নয়ন প্রকল্পের স্থাপনা দখল করে রাজনৈতিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করার এই সংস্কৃতি আমাদের নগর প্রশাসনের দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার অভাবকেই নির্দেশ করে। পুরান ঢাকার মতো জনবহুল এলাকায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এমন প্রকল্পের প্রতি নাগরিক প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল। প্রকল্প পরিচালকের পক্ষ থেকে এস্টেট বিভাগকে জানানোর কথা বলা হলেও, গত এক বছরেও দখলমুক্ত না হওয়া প্রমাণ করে যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কতটা উদাসীন। দ্রুত এই স্থাপনা দখলমুক্ত করে জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা এবং প্রকল্পের বাকি কাজ সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকায় নির্মিত এই অবকাঠামো সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে না এসে কেবল রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্র হিসেবেই টিকে থাকবে। নগর কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে প্রভাবশালীদের তোয়াক্কা না করে আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি সম্পদ পুনরুদ্ধার করা।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ