আদরের রাজকন্যা আমার, আজ তুই একুশ পার করছিস। রাত পোহালেই বাইশ!
চোখের পলকে বড়ো হয়ে গেলি মা!
এই তো সেদিন, মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে কান্না করতি- আমি কাঁধে নিয়ে হাঁটতাম। বাবার কাঁধে মাথা রাখলেই কান্না বন্ধ করে আমার জামা জিহবা দিয়ে চেটে ভিজিয়ে দিতি।
আমার খুব ইচ্ছে করে সেদিনগুলো জোর করে টেনে ফিরিয়ে আনতে।
কিন্তু সময় কারো কাছে ফিরে আসে না। তবে সময় চলে গেলেও কথা থেকে যায়। এমন কি যিনি বলেন তিনি চলে গেলেও তা প্রতিধ্বনি হয়ে কানে বাজে।
তাই আমি কিছু কথা বললাম- মাথায় রাখিস। বাবার কথা মাথায় রাখলে লাভ না হোক ক্ষতি অন্তত হয় না।
১ ) দেখতে সুন্দর হলে কী হবে, কাচের বল মাটিতে পড়লে ভেঙে যায়, কিন্তু রাবারের বল মাটিতে পড়লে লাফ দিয়ে উপরে উঠে। তাই কাচের বল নয়, রাবারের বল হবি। যাতে আছাড় খেলে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারিস।
২ ) পৃথিবীতে নিজেকেই টিকে থাকতে হয়। কারো উপর ভর করে টিকে থাকা হচ্ছে, পরগাছার জীবন। এ জীবন করুণার। নিজের পায়ে দাঁড়া, মা। যখনই থমকে যাবি, তখনই শুনতে পাবি বাবা বলছি- ‘রান, মাই লিটল গার্ল, রান।’
আমার কণ্ঠ শোনামাত্র আবার দৌড়ানো শুরু করবি।
৩ ) সব সময় সুন্দরের পেছনে ছুটবি। যে সুন্দরের পেছনে ছুটে সেও সুন্দর হয়ে যায়। কারণ অসুন্দর তাকে স্পর্শ করতে পারে না।
৪ ) আমরা যা ভাবি তাই ঘটে। কেউ যদি ভাবে দশ বছর পর সে হার্ভার্ডে পড়বে আসলেই দশ বছর পর সে সেখানে পড়বে। কারণ ভাবনাটাই তাকে তাড়িয়ে সেখানে নিয়ে যাবে। আর কেউ যদি ভাবে দশ বছর পর আমার কিছু হবে না। তাহলে আসলেই কিছু হবে না। কারণ নেগেটিভ ভাবনাটি তাকে কিছু হওয়ার তাড়না দেবে না।
৫ ) মানুষের দোয়া কামানোর চাইতে অভিশাপ কামানো সহজ। কারণ অন্যের উপকার করা কঠিন, কিন্তু ক্ষতি করা সহজ। তাই তোকে দোয়া কামানোর জন্য কঠিন পথটিকে বেছে নিতে হবে।
৬ ) তোর একটা নিজস্ব জগৎ তৈরি হচ্ছে- সেখানে আলো জ্বালানোর দেয়াশলাই তোর হাতে। আর কারো হাতে নয়। তাতে আগুন জ্বালা মা- জীবন আলোকিত কর।
৭ ) তারুণ্যে বাবা-মাকে বোকা মনে হয়, শিক্ষকদের বোকা মনে হয়। সব বয়স্কদের বোকা মনে হয়। আসলে কথাটা সত্যি নয় রে, মা। বয়স্করা বোকা নয়- তাঁরা অভিজ্ঞ। এজন্যই বলা হয়, একজন প্রবীণ মানুষ মারা যাওয়া মানে একটি প্রাচীন লাইব্রেরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া।
৮ ) বাবারে, বড় হচ্ছিস, কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে নিজের বিবেকের কথা শুনবি। নিজ বিবেকের চাইতে ভালো পরামর্শদাতা আর কেউ নেই।
৯ ) মা, যে জীবন শুধু নিজের ভালোর জন্য নিবেদিত হয় তা কেঁচোর জীবন। মানুষ হয়ে জন্মে কেঁচো হয়ে যাওয়া অনেক বড়ো দুর্ভাগ্য।
১০ ) মা, আমি যেদিন আঠারোতে পা দিয়েছিলাম, তোর দাদাভাই সেদিন কলোনির মুয়াজ্জিন হুজুরকে বাড়ি নিয়ে এসে বলেছিলেন- ‘আমার ছেলেটা আঠারোয় পা দিলো, তার জন্য একটু দোয়া করুন।’
বৃদ্ধ হুজুর হাত তুলে বলেছিলেন- ‘ইয়া পরোয়ার দিগার, একটা মাসুম বাচ্চা বড়ো হয়ে যাচ্ছে, বাকি জীবনও তুমি তাকে ‘মাসুম’ থাকার তওফিক দিও।
তোর বাইশে পা রাখার আগমুহূর্তে আমিও প্রার্থনা করি- তুই মাসুম হিসেবে পৃথিবীতে এসেছিলি- যাতে পুরো জীবন মাসুম থাকতে পারিস। আমি তোর খ্যাতি চাই না, বিত্ত চাই না, শুধু চাই তোর আয়ু এবং মহত্ত্ব।
শুভ জন্মদিন মা। শুভ জন্মদিন।
এ জাতীয় আরো খবর...