সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১২:৪২ পূর্বাহ্ন

হাম ও ডেঙ্গুর দ্বিমুখী চাপ হাসপাতালে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৮ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশ বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের এক কঠিন ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ, অন্যদিকে বর্ষার আগমনে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই দুই রোগের রোগীর উপচে পড়া ভিড় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে। সংক্রমণের এই দ্বিমুখী স্রোত শুধু সাধারণ মানুষের আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয়নি, বরং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী চিকিৎসক ও কর্মীদের জন্য এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। এখন পর্যন্ত এই রোগ ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৬০ জন শিশু চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে ভিড় করেছে। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, এই দীর্ঘ সময়ে মোট ৭০৮ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে সরাসরি হামে ৯৩ জনের এবং হামের জটিল উপসর্গে ৬১৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শুধু গত ২৪ ঘণ্টার হিসাব নিলে দেখা যায়, নতুন করে আরও ছয়টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহে এই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, যেখানে চারজন শিশু প্রাণ হারিয়েছে; এছাড়া ঢাকা ও খুলনাতেও আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারা দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড বা কেবিন চালু করা বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে শয্যা সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৬৯৩ জনের শরীরে ল্যাবরেটরিতে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা সামগ্রিক সংক্রমণের একটি বড় অংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার কাভারেজ কম হওয়া এবং মাইক্রোপ্ল্যান অনুযায়ী টিকাদান কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না করায় হাম নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।

হামের ভয়াবহতার মধ্যেই বর্ষাকালের শুরুটা ডেঙ্গুর জন্য এক নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২০০ জনেরও বেশি রোগী ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন হয়, কারণ তাদের মশারির ভেতরে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। আক্রান্ত রোগীকে মশা কামড়ালে সেই মশা অন্যদের কামড়ে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে দিতে পারে, যা ডেঙ্গু বিস্তারের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার সতর্ক করে বলেছেন, এবারের পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তার সাম্প্রতিক গবেষণায় ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপক সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ২০-এর ওপরে পাওয়া গেছে। দুঃখজনকভাবে, কোনো কোনো এলাকায় এই সূচক ৯৩ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। সাধারণত এই সূচক ২০-এর বেশি হওয়া মানেই এলাকাটি মশাবাহিত রোগের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।

এক সময় ডেঙ্গু কেবল ঢাকা শহরের সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও, বর্তমানে এর ঝুঁকি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে। চট্টগ্রাম, বরিশাল, পিরোজপুর, চাঁদপুর, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় এখন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চল এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মশার প্রজননস্থল ও লার্ভার উপস্থিতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এসব এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ এবং লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, “হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ঢাকা শহরের অফিসে বসে পরিকল্পনা করলে হবে না, বরং তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি বা সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে টিকার কাভারেজ বাড়াতে হবে।” পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং মশক নিধনে পর্যাপ্ত কীটনাশক সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

চিকিৎসকদের মতে, হাম ও ডেঙ্গু—উভয় রোগের সংক্রমণের এই দ্বিমুখী চাপ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে হাসপাতালের শয্যা ও জনবলের তীব্র সংকট দেখা দেবে। রোগীরা যেমন চিকিৎসা পেতে কষ্ট পাবে, তেমনি চিকিৎসকদের ওপরও কাজের চাপ অসহনীয় হয়ে পড়বে। তাই শুধু হাসপাতালের চিকিৎসা নয়, বরং রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রিভেন্টিভ হেলথকেয়ার বা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় সরকারকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

একটি জনস্বাস্থ্য সংকট যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হাম ও ডেঙ্গুর বর্তমান যৌথ আক্রমণ। আক্রান্তের সংখ্যা কমিয়ে আনতে এবং মৃত্যুহার রোধ করতে হলে এখনই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। লার্ভা ধ্বংস করার পাশাপাশি শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি পূর্ণমাত্রায় সফল করা না গেলে আগামী দিনগুলোতে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকেই যায়। সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে, বিশেষ করে শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে বা ডেঙ্গু সদৃশ উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের এই সংকটের মোকাবিলা করতে এখন আর কালক্ষেপণের সুযোগ নেই।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


এ জাতীয় আরো খবর...