শিরোনামঃ
বাড়ি ভাড়া নেওয়ার আগে: ১০টি পরামর্শ ডাকলেই কাছে চলে আসবে টয়লেট! মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী রাজনীতিবিদদের ভুল তুলে ধরা সাংবাদিকদের দায়িত্ব: মির্জা ফখরুল খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন বিদেশি অতিথি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা তেহরানে গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন এলপিজির দাম কমেছে, ধাপে ধাপে জ্বালানি তেলও কমানো হবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফুটবল দর্শনে দেশীয় ফুটবলের রূপান্তর পরিকল্পনা সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী অপহরণ মামলায় সাবেক এএসপি গ্রেপ্তার তেহরানে খামেনির জানাজায় রেকর্ড জনসমাগমের আশা
শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ন

কূটনৈতিক সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আন্তদেশীয় ট্রেন

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৮ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশিদের জন্য দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর ভারতীয় ট্যুরিস্ট বা পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু হওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। ভিসা কেন্দ্রগুলোতে আবেদনকারীদের উপচে পড়া ভিড়ের মাঝেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বন্ধ থাকা তিনটি জনপ্রিয় যাত্রীবাহী আন্তদেশীয় ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করার বিষয়টি। তবে পর্যটন ভিসার দুয়ার খুললেও মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো এখনই লাইনে ফিরছে না। রেলওয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ট্রেন চলাচলের এই বিষয়টি নিছক কোনো পরিবহনসেবা নয়; এটি পুরোপুরি দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। ফলে কারিগরি প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের সবুজ সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত এই চাকা শিগগিরই সচল হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগ জোরদারে ঢাকা-কলকাতা রুটে মৈত্রী এক্সপ্রেস, খুলনা-কলকাতা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস এবং ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি রুটে মিতালী এক্সপ্রেস নিয়মিত চলাচল করত। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান ও তীব্র রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালীন নিরাপত্তার স্বার্থে ওই বছরের ১৯শে জুলাই থেকে এই তিনটি ট্রেনের চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। এরপর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে দীর্ঘ দিন পর্যটন ভিসা দেওয়া বন্ধ রাখে ভারত। সম্প্রতি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলো পুনরায় ট্যুরিস্ট ভিসা দেওয়া শুরু করলেও ট্রেন চালুর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। বাংলাদেশ রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানিয়েছে, গত দুই বছরে দ্বিপক্ষীয় রেল যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করতে ভারতের রেলওয়ে বোর্ডকে তিন দফায় আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হলেও ওপার থেকে কোনো সাড়া বা লিখিত জবাব মেলেনি।

তবে সম্প্রতি ভারতের পূর্ব রেলওয়ের বিভাগীয় রেল ব্যবস্থাপক রাজিব সাক্সেনা কলকাতায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে, কারিগরি দিক থেকে ভারতীয় রেল সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশে আটকে থাকার পর মিতালী এক্সপ্রেসের কোচগুলো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত বা যাত্রী পরিবহনের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় সেগুলোকে ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ভারতের কাছে পর্যাপ্ত বিকল্প কোচের মজুদ থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ আসা মাত্রই বিশেষ ট্রেনের মতো দ্রুততার সঙ্গে নতুন রেক বা কোচ বিন্যাস করে ট্রেনগুলো চালু করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, কারিগরি কোনো বাধা না থাকলেও মূল সিদ্ধান্তটি এখন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক টেবিলে ঝুলে আছে।

এই বিষয়ে বাংলাদেশের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানান, ভিসা চালু হওয়া একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত এবং এর ফলে ট্রেন চলাচলের বিষয়টিও দ্রুত সুরাহা হয়ে যাবে বলে তারা আশাবাদী। দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা দুই দেশের রেলওয়ের মধ্যকার বার্ষিক ‘৩৮তম ইন্টারগভর্নমেন্টাল রেলওয়ে মিটিং’ (আইজিআরএম) খুব শিগগিরই বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে এই সভার একটি প্রস্তুতিমূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বৃদ্ধি, ক্রস-বর্ডার কানেক্টিভিটি এবং যৌথ রেল প্রকল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ ২৯টি অ্যাজেন্ডা বা এজেন্ডা নিয়ে বিস্তারিত রোডম্যাপ তৈরি করা হয়।

যোগাযোগ ও ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর ঢাকা ও নতুন দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে যে শীতলতা বা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই রেল যোগাযোগের ওপর। তবে ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী এবং প্রবীণ বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনারের দায়িত্ব পাওয়ায় এই অচলাবস্থা কাটার একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রেলের আধুনিকায়ন ও আন্তদেশীয় যোগাযোগে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা দুই দেশের আলোচনাকে গতিশীল করতে পারে। এর পাশাপাশি, মৈত্রী এক্সপ্রেসকে ভবিষ্যতে পুরোনো যমুনা সেতুর পরিবর্তে নবনির্মিত পদ্মা সেতু হয়ে সরাসরি কলকাতায় চালানোর একটি কারিগরি পরিকল্পনাও সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ভ্রমণের সময় ও দূরত্ব এক ধাক্কায় অনেক কমে আসবে। তবে রুট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক চুক্তি সংশোধন এবং নতুন করে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের মতো বেশ কিছু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিঊজ্জামান উল্লেখ করেন যে, এই আন্তর্জাতিক ট্রেনগুলো বন্ধ থাকার পেছনে ভূ-রাজনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলোই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে সমস্ত রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে গিয়ে বাস্তব সত্য হলো, বাংলাদেশ ও ভারত ভৌগোলিকভাবে চিরস্থায়ী প্রতিবেশী। দুই দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা, ব্যবসা, পর্যটন ও আত্মীয়তার সুবাদে যে নিবিড় আত্মিক যোগাযোগ রয়েছে, তা সচল রাখতে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ রেল যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে সব ধরনের রাজনৈতিক জটিলতা পাশ কাটিয়ে যাত্রীবাহী এই তিনটি আন্তদেশীয় ট্রেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালু করা এখন দুই দেশেরই দূরদর্শিতার পরিচয় দেবে।

 

তথ্যসূত্র: দৈনিক আজকের পত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...