বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন

দেড় মাসের ফুটবল উন্মাদনা: শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রাপ্তি ও হিসাব-নিকাশ কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৩ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বকাপ ফুটবলের মহারণ শেষ হয়েছে কিছুদিন আগেই। মাঠের লড়াই থেমেছে, সবুজ ঘাসের ওপর জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত সমীকরণ মিলেছে, আর শেষ বাঁশি বাজার পর বিজয়ী দলের খেলোয়াড়েরা ট্রফি উঁচিয়ে উম্মাদনায় মেতে উঠেছিলেন। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় স্পন্দিত করা সেই দেড় মাসের উত্তেজনাকর মহাযজ্ঞের পর্দা অবশেষে নেমেছে। কিন্তু ঝলমলে এই আয়োজনের কোলাহল শান্ত হওয়ার পর, যখন চারপাশের উন্মাদনা কিছুটা থিতিয়ে এসেছে, তখন প্রতিটি সাধারণ মানুষের কাছে একটি অত্যন্ত গভীর ও আত্মোপলব্ধিমূলক প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে—এই দেড় মাসের বিপুল উন্মাদনা শেষে একজন ব্যক্তি হিসেবে বা সমাজ হিসেবে আসলে আমাদের প্রাপ্তিটা কী? চারপাশের ঝলমলে আলো আর কোলাহলের আড়ালে যদি একটু গভীরভাবে চোখ রাখা যায়, তবে দেখতে পাওয়া যাবে যে, এই বিশাল আয়োজনের পেছনে আমাদের প্রাপ্তির ঝুড়িতে আনন্দের চেয়ে আক্ষেপ ও বিসর্জনের পরিমাণই হয়তো বহু গুণে বেশি।

বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে পত্রিকার পাতা বা সংবাদের দিকে নজর দিলে এক মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার ছবি ফুটে ওঠে। দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে দ্য ডেইলি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এবং দ্য ডেইলি স্টারের মতো দায়িত্বশীল সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে চলা এই উন্মাদনার সময়ে শুধু আমাদের দেশেই অন্তত ১২ জন মানুষ তাদের মূল্যবান জীবন হারিয়েছেন। এই মৃত্যুর মিছিলের পেছনের ঘটনাগুলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং দুঃখজনক। কোথাও পছন্দের দল বা খেলোয়াড় নিয়ে সমর্থকদের তুচ্ছ তর্ক-বিতর্ক গড়িয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে, যা শেষ পর্যন্ত খুনের মতো জঘন্য অপরাধে রূপ নিয়েছে। কোথাও আবার নিজের প্রিয় দলের আকাশচুম্বী পতাকা খাটাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মর্মান্তিক প্রাণহানির শিকার হতে হয়েছে তরতাজা কিছু প্রাণকে। শুধু তাই নয়, চরম উন্মাদনার বশে উঁচু ভবন বা গাছের ডালে উঠে সমর্থক ও খেলোয়াড়দের ছবি তুলতে গিয়ে নিচে পড়ে গিয়েও জীবন দিতে হয়েছে অনেককে। অতিরিক্ত উত্তেজনার চাপে কিংবা প্রিয় দলের শোচনীয় পরাজয়ের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন অনেকেই। এর বাইরেও হতাশার চরমসীমায় পৌঁছে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেওয়ার মতো করুণ খবর সামনে এসেছে, যদিও তার সবগুলোর সুনির্দিষ্ট দাপ্তরিক প্রমাণ মেলে না। যেকোনো মৃত্যুই গভীর বেদনার, কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে মানুষের এমন অনভিপ্রেত প্রাণহানি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও আবেগের অনিয়ন্ত্রিত রূপকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, যারা এই মৃত্যুর মিছিলে শামিল হয়েছেন কিংবা সরাসরি সহিংসতায় জড়িয়েছেন, ক্ষতিটা কেবল তাদেরই হয়েছে; কিন্তু একজন সাধারণ নীরব দর্শক হিসেবে আপনার বা আমার তো কোনো ক্ষতি হয়নি। বাস্তবতা হলো, প্রথম দৃষ্টিতে এমনটা মনে হলেও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, এই উন্মাদনার স্রোতে গা ভাসিয়ে আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের অজান্তে বিপুল ক্ষতি করে ফেলেছি। প্রথমত, আমরা হারিয়েছি আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—সময়। দিনের পর দিন, গভীর রাত জেগে টানা খেলা দেখতে গিয়ে আমরা আমাদের অসংখ্য মূল্যবান ঘণ্টা নষ্ট করেছি, যা আমাদের ক্যারিয়ার, পড়াশোনা কিংবা ব্যক্তিগত উন্নয়নে কাজে লাগানো যেত। রাত জেগে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার এই অভ্যাস শুধু সময় নষ্ট করেনি, বরং নীরবে আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্যকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঘুমহীনতা, মানসিক ক্লান্তি এবং দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয়ে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতার বীজ রোপণ করেছে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে। ফুটবল দল ও পছন্দের খেলোয়াড়দের সমর্থন করা নিয়ে বন্ধুদের সাথে, সহকর্মীদের সাথে কিংবা পরিবারের সদস্যদের সাথে আমরা অহেতুক তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়াঝাটিতে লিপ্ত হয়েছি। আবেগ আর যুক্তির ভারসাম্য হারিয়ে প্রিয় মানুষদের মন ভেঙেছি, বহুকালের বিশ্বস্ত ও মধুর সম্পর্কগুলোতে চির ধরিয়েছি। অথচ খেলা শেষে যখন সবকিছু শান্ত হয়ে যায়, তখন সেই তর্কের কোনো মূল্য থাকে না, কিন্তু ভাঙা সম্পর্কগুলো আর আগের মতো সহজ হতে পারে না।

একটু ঠান্ডা মাথায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলে এক নির্মম সত্য উন্মোচিত হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপ ফুটবল কিংবা এই ধরনের বিশাল আয়োজনের প্রকৃত স্বরূপ কোনো বিশুদ্ধ খেলাধুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি রূপ নিয়েছে এক বিশাল বহুজাতিক ও বৈশ্বিক ব্যবসায়। আন্তর্জাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করে মানুষের আবেগ, দলপ্রীতি এবং মানসিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে তাদের বিপুল আর্থিক সাম্রাজ্য বিস্তার করে। সাধারণ মানুষকে একটি অলীক উন্মাদনার মধ্যে বুঁদ করে রেখে তারা সময়, অর্থ এবং মনোযোগ কেড়ে নেয়, যার চূড়ান্ত সুবিধা পায় কয়েকটি বিশ্বব্যাপী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখন হয়তো বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দা নেমেছে এবং সাময়িকভাবে সেই কোলাহল স্তব্ধ হয়েছে, কিন্তু কর্পোরেট এই বাজারব্যবস্থার খেলা কখনো শেষ হয় না। খুব জলদিই নতুন কোনো জাতীয়, বৈশ্বিক বা বিনোদনমূলক ইভেন্ট সামনে নিয়ে আসা হবে, যা আবার মানুষকে একইভাবে উন্মাদ করে তুলবে এবং তাদের ভেতরের স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধিকে গ্রাস করে নেবে। আপনি যদি নিজেকে নিজে না চিনতে পারেন, আপনার আত্মনিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে বাজারব্যবস্থার এই চতুর চক্র বারবার আপনাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবে এবং আপনার জীবনকে শূন্যতায় ভরিয়ে তুলবে।

এই অন্তহীন এবং আত্মঘাতী চক্র থেকে মুক্ত হওয়ার একমাত্র উপায় হলো গভীর আত্মোপলব্ধি এবং নিজস্ব জীবনবোধকে জাগ্রত করা। এই পৃথিবীতে একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আপনার মূল অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটিগুলো কী, কোন সম্পর্কগুলোকে আপনি জীবনের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন এবং আপনার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী—এসব বিষয়ে যদি স্পষ্ট ধারণা না থাকে, তবে সমাজ ও কর্পোরেট দুনিয়া আপনাকে প্রতিনিয়ত তাদের ইচ্ছেমতো চালনা করবে। আপনাকে বুঝতে হবে যে, পৃথিবীর কোনো খেলা, কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি কিংবা কোনো বহুজাতিক আয়োজন আপনার ব্যক্তিগত সুখ, মানসিক শান্তি বা জীবনের ভালো থাকা নির্ধারণ করে দিতে পারে না। আপনার ভালো থাকা বা খারাপ থাকা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে আপনার নিজের মানসিক সচেতনতা এবং নিজস্ব ভেতরের পরিস্থিতির ওপর। যেদিন আপনি বুঝতে পারবেন যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কোন কাজটিকে আপনি নিজের জীবনে গ্রহণ করবেন এবং কোন ক্ষতিকর উন্মাদনাকে বর্জন করবেন—সেই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করাই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। যেদিন একজন মানুষ নিজের আবেগ ও সময়ের ওপর এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, ঠিক সেদিনই তিনি জীবনের প্রকৃত ও চূড়ান্ত স্বাধীনতা লাভ করতে পারেন।


এ জাতীয় আরো খবর...