বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:১০ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর একক কৃতিত্বের দাবি প্রিয়াঙ্কার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে একপাশে সরিয়ে রেখে পাকিস্তান ভেঙে নতুন রাষ্ট্র গঠনের পুরো কৃতিত্ব তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দিয়েছেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। সম্প্রতি ভারতীয় লোকসভায় দেওয়া এক ভাষণে কংগ্রেসের এই সাধারণ সম্পাদক দাবি করেছেন যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সফলতা মূলত ভারতের এবং তা অর্জিত হয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে। তাঁর মতে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চাপ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ দক্ষতার সঙ্গে সামলে ইন্দিরা গান্ধীই পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন। বক্তব্যে প্রিয়াঙ্কা একাত্তরে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণকেও তাঁর দাদীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন।

ভারতীয় লোকসভায় প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এই বয়ান দেওয়ার সময় উপস্থিত কংগ্রেস সদস্যরা করতালি দিয়ে তা সমর্থন জানান। সেই সময় পার্লামেন্টে উপস্থিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে উদ্দেশ্য করে প্রিয়াঙ্কা বলেন, শুধু যেকোনো রাজনৈতিক সাফল্যের কৃতিত্ব নিলেই প্রকৃত নেতৃত্ব তৈরি হয় না, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করাটাই আসল রাজনীতি। নরেন্দ্র মোদীর কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি একাত্তরের ঘটনাকে ইন্দিরা গান্ধীর ঐতিহাসিক অবদান হিসেবে তুলে ধরেন।

প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এই বক্তব্যের পর নানা মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের প্রাণদান, অগণিত নারীর আত্মত্যাগ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম বীরত্বকে সম্পূর্ণ খর্ব করা হয়েছে। ঘটনাটিকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের বদলে কেবল প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভূরাজনৈতিক চাল হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতীয় কংগ্রেস নেত্রীর এই বক্তব্য মূলত ১৯৭১ সালের ঘটনাকে ভারতের একক সামরিক ও প্রশাসনিক সাফল্য হিসেবে দেখার প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় বয়ানকেই নতুন করে সামনে এনেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় বিজয়ের পর তৎকালীন ভারতীয় নেতৃত্বের একাংশ দুই পাকিস্তান আলাদা হওয়াকে ঐতিহাসিক কৌশলগত অর্জন হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বক্তব্যেও সেই একই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা গেছে।

এই ধরনের বয়ানের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার দাবি জোরদার হচ্ছে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে কেবল ১৯৭১ সালের নয় মাসের ঘটনা বা আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক কৌশলের পরিণতি হিসেবে দেখা সঠিক নয়। বরং একে দেখতে হবে এ অঞ্চলের মানুষের শত বছরের শোষণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন, সিপাহী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে অর্জিত এই রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা কোনো একক বিদেশি ব্যক্তির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা বিশেষ কোনো দেশের একক কৃপায় অর্জিত হয়নি। ফলে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মাধ্যম বা একক কৃতিত্ব হিসেবে প্রচারের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

তথ্যসূত্র: আমার দেশ


এ জাতীয় আরো খবর...