বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৭ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে ঢাকায় আসছেন মার্কিন বিশেষ দূত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢাকার কূটনৈতিক তৎপরতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের যোগাযোগ গভীর হওয়ার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রশাসন ঢাকার নতুন পররাষ্ট্রনীতির সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রত্যক্ষ করতে চায়। এই ধারাবাহিকতায় চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে প্রথমবারের মতো সরকারি সফরে ঢাকায় আসছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সের্গেই গর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে পরিচিত এই বিশেষ দূতের মূল মিশন হবে বাংলাদেশের বর্তমান কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রধান বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের সমীকরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ২৮ জুলাই বিদেশ সফর শেষে দেশে ফেরার পরপরই তার সময়সূচির সাথে সমন্বয় করে মার্কিন বিশেষ দূতের চূড়ান্ত বৈঠকগুলো নির্ধারণ করা হবে।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত কোনো সাধারণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার উদ্দেশ্যে বিশেষ দূত পাঠানো হয় না, বরং বিশেষ কোনো ভূরাজনৈতিক বার্তা প্রদান কিংবা পরিস্থিতি মূল্যায়নের উদ্দেশ্যেই এমন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠানো হয়ে থাকে। তাই সের্গেই গরের এই সফরের পেছনে বাণিজ্য বা বাণিজ্যিক ছাড়ের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক বিষয়াবলী। বিশেষ করে এক মাস আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পরপরই এই মার্কিন দূতের আগমনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। জুনের সেই সফরে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ, তিস্তা নদীর মহাপরিকল্পনা এবং প্রতিরক্ষা খাতে বেইজিংয়ের বিপুল বিনিয়োগের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তা ওয়াশিংটনের নজর এড়ায়নি। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে।

এমন এক উত্তপ্ত আঞ্চলিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটন জানতে চায় যে, বিশ্বমঞ্চে কৌশলগত প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সাথে বর্তমান প্রশাসনের সুসম্পর্কের গভীরতা ঠিক কতদূর বিস্তৃত হচ্ছে, সেটিই হবে মার্কিন বিশেষ দূতের পর্যালোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি রাশিয়া সফরে গিয়ে সেখানে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে বিস্তৃত বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তানের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বিষয়ে নতুন সরকারের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা মার্কিন সরকারের ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঢাকাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নতুন যে সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা বোঝার তাগিদ দিন দিন বাড়ছে।

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে সের্গেই গর সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাপ্তরিক কেন্দ্র হোয়াইট হাউসে রিপোর্ট করে থাকেন। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা মার্কিন রাজনীতির আইনসভা ও সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। মার্কিন রাজনীতিতে তাঁর এই উচ্চ প্রভাবের কারণেই ঢাকা সফরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, চলমান ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, প্রতিবেশী মিয়ানমারের অস্থিতিশীল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের নেতিবাচক প্রভাব কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন ঢাকার সাথে মতামত বিনিময় করবে। কারণ এসব ইস্যু বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্যিক নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

সর্বোপরি, বাংলাদেশের কূটনৈতিক গুরুত্ব যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই মার্কিন বিশেষ দূতের আগমন স্পষ্ট করে যে, ঢাকাকে নিয়ে ওয়াশিংটনের আগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ বেশ জোরালো। বাংলাদেশ বর্তমানে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল না থেকে যে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের পথ বেছে নিয়েছে, এই সফরের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ অনেকটাই নির্ধারিত হতে পারে।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


এ জাতীয় আরো খবর...