শিরোনামঃ
*ছেলের জন্য পাত্রী: ১০টি পরামর্শ ও ১টি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন* অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর স্পিকারের জন্য বিশেষ প্রটোকল গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে কাজ করছে সরকার: মির্জা ফখরুল লন্ডনের হোটেলে অতিরিক্ত মদ্যপানে সৌদি রাজপুত্রের মৃত্যু ২৪ ঘণ্টার কম সময়ে ট্রাম্প যেভাবে উল্টে দিলেন সৌদি পরমাণু চুক্তি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়, অপরাধ বেড়েছে: জামায়াত আমির ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী দেশে জন্ম নেওয়া অর্ধেক শিশু সিজারের শিকার তীব্র গ্যাস সংকট: বন্ধের মুখে দেশের শত শত কারখানা
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৪ পূর্বাহ্ন

৫০ কোটির বেশি ঋণগ্রহীতাদের ৪২ শতাংশ খেলাপি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে দিন দিন ঘনীভূত হতে থাকা খেলাপি ঋণের গভীর সংকট মূলত বৃহৎ কর্পোরেট ও শক্তিশালী ঋণগ্রহীতাদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ ও সর্বশেষ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়া ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের মোট ঋণের প্রায় ৪২ দশমিক ৫ শতাংশই এখন আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এর বিপরীতে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি অংকের ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম, যার পরিমাণ মাত্র ১৫ শতাংশ। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বড় অংকের ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির এই আশঙ্কাজনক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্রেফ ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক ব্যর্থতার ফল নয়। এটি মূলত বছরের পর বছর ধরে চলে আসা ভঙ্গুর ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রবল রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক জবাবদিহির তীব্র অভাব এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের সুশাসন ব্যবস্থার বড় ধরনের ধসের এক প্রত্যক্ষ ও করুণ পরিণতি।

ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বলছেন, ছোট ও মাঝারি শ্রেণির উদ্যোক্তারা (এসএমই) তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ গ্রহণ করলেও তা নির্ধারিত সময়ে পরিশোধের ব্যাপারে সবসময় সর্বোচ্চ তৎপর থাকেন। নিজেদের ব্যবসা সচল রাখা এবং বাজারে সম্মান বজায় রাখার তাগিদেই তারা যেকোনো মূল্যে ঋণের কিস্তি নিয়মিত শোধ করাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। কিন্তু এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায় দেশের বড় বড় কর্পোরেট ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে। অপেক্ষাকৃত কম সুদে হাজার কোটি টাকার ঋণসুবিধা পেয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী এসব গ্রাহক তা ফেরতে চরম গড়িমসি ও অনাগ্রহ প্রদর্শন করেন। এমনকি ঋণখেলাপি হওয়ার পরও তারা আইনি কিংবা প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে পুনঃতফসিলীকরণ, সুদ মওকুফ কিংবা নানাবিধ বিশেষ সরকারি ছাড় বাগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান। এর ফলে আর্থিক খাতে একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর ও অনৈতিক ‘ঋণ না দেওয়ার সংস্কৃতি’ পাকাপোক্ত রূপ নিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতির ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে।

পরিসংখ্যানের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরের ব্যবধানে বড় অঙ্কের ঋণের পরিমাণ যেমন দ্রুত বেড়েছে, ঠিক তেমনই পাল্লা দিয়ে অবনতি ঘটেছে ঋণের মানের। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণের মধ্যে খেলাপির হার ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ, যা মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালের মার্চে লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশে। এ সময় বড় ঋণের মোট স্থিতির পরিমাণ ৫ লাখ ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। অন্যদিকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ছোট ঋণের ক্ষেত্রে মোট ঋণস্থিতি ৪ লাখ ৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা হওয়া সত্ত্বেও খেলাপির হার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য আরও প্রকাশ করে যে, ঋণের পরিমাণ যত বৃদ্ধি পায়, খেলাপির ঝুঁকিও ঠিক ততটাই বাড়ে। যেমন ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি সর্বোচ্চ ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণের ক্ষেত্রে তা ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর যথাযথ ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের চরম অভাব ছিল। রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে নীতিমালা শিথিল করে যেসব বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, পরবর্তীতে সেগুলোর আসল বা সুদ আদায় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নীতি নির্ধারকদের মতে, অতীতে ঋণ ছাড়ের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত নগদ প্রবাহ, প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও ঝুঁকি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। যার ফলে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ের স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে রাইট-অফ বা বই থেকে নাম মুছে ফেলা এবং বার বারবার পুনঃতফসিলের সহজ পথ বেছে নিয়েছে, যা কোনো স্থায়ী সমাধান আনেনি। এই বৈষম্যমূলক নীতির কারণে ছোট ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে সামান্য কিস্তি বকেয়া পড়লেই ব্যাংকগুলো দ্রুত আইনি বা বাজেয়াপ্তির কঠোর পদক্ষেপ নেয়, আর বড় বড় খেলাপির বেলাতেই সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও নমনীয় ভূমিকা পালন করে।

সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে দেশের মোট খেলাপি ঋণের হার যেখানে ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ, তা একই বছরের ডিসেম্বরে বেড়ে ৩১ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের মার্চে পৌঁছেছে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে। ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা মনে করেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই দেশের প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতকে বাঁচিয়ে রাখছেন এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছেন। অথচ বড় ঋণগ্রহীতাদের বড় অংশের মধ্যে ঋণ ফেরত না দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হওয়ায় তা এখন জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ও নিজেদের আর্থিক ঝুঁকি কমাতে বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংক বড় অঙ্কের নতুন ঋণ বিতরণে চরম কড়াকড়ি আরোপ করছে এবং তুলনামূলক নিরাপদ ছোট ও মাঝারি মানের ঋণ দেওয়ার দিকে নিজেদের মনোযোগ ঘোরাতে শুরু করেছে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...