কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রধান ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আকস্মিক ও মারাত্মক যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেওয়ায় সারাদেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা জাতীয় গ্রিডে দৈনিক মোট চাহিদার মাত্র ৫৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করতে সক্ষম হওয়ায় শিল্প খাতে এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়েছে। অধিকাংশ শিল্প এলাকায় বিতরণের গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়ে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ফলে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলগুলোর শত শত তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানা পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা না গেলে রফতানি আদেশ বাতিলের পাশাপাশি পুরো শিল্প খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানে অপূরণীয় ধস নামবে বলে মারাত্মকভাবে সতর্ক করেছেন শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি বস্ত্র ও ডাইং খাত। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, কারখানা পরিচালনা করার জন্য যেখানে সর্বনিম্ন ১০ পিএসআইজি গ্যাসের চাপের প্রয়োজন হয়, সেখানে বেশিরভাগ শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ১.৫ পিএসআইজিতে। অনেক কারখানায় তা শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। সংকটের জাঁতাকলে পড়ে ইতিমধ্যেই দেশের অন্তত ১২১টি স্পিনিং মিল তাদের সমুদয় উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে নিটওয়্যার খাতের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান বিকেএমইএ জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ ডাইং ও ফিনিশিং কারখানায় কাজ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে গেছে। সিএনজি স্টেশন থেকেও সিলিন্ডারে করে গ্যাস এনে সামাল দেওয়ার বিকল্প পথ বন্ধ হয়ে পড়ায় রফতানিমুখী পোশাকের আইরনিং ও কাপড়ের প্রসেসিং থমকে গেছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো অসম্ভব করে তুলেছে।
গাজীপুরের মতো বিশাল শিল্পাঞ্চলের দৈনিক ৫৯ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে তিতাস সরবরাহ করতে পারছে মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুট। এই চরম ঘাটতির মুখোমুখি হয়ে বিকল্প হিসেবে বহুমুখী লোকসান গুনে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছেন উদ্যোক্তারা। তবে এতে শুধু একটি মাঝারি কারখানারই দৈনিক অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত, যা রফতানি পণ্যের অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে ময়মনসিংহের ভালুকায় গ্যাস সরবরাহ ঘন ঘন বন্ধ হওয়ার কারণে কারখানার কোটি কোটি টাকার সংবেদনশীল টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি ও দামি জেনারেটর বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। একের পর এক অর্ডার বাতিল এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের মানসিক চাপে ইতোমধ্যেই অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটতে শুরু করেছে, যা সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকাকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জ্বালানি সংকটের এই বিধ্বংসী ঢেউ লেগেছে সার উৎপাদনের মতো দেশের কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত খাতগুলোতেও। চট্টগ্রামের সিইউএফএল (চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি) গ্যাস সরবরাহের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না পাওয়ায় চার মাস ধরে তাদের পুরো উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির করে রাখতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান না হওয়া পর্যন্ত এই বিশাল শিল্প কারখানা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে কাফকো ও ডিএপি ফার্টিলাইজারে গ্যাস মিললেও কাঁচামালের সার্বিক সংকটে স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কৃষি খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক কাঁচামাল সময়মতো উৎপাদন না হলে তা সার্বিক জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর আরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংকটের এই ধারাবাহিক প্রভাব নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থায়িত্বকেও গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যমান কলকারখানাগুলো যেখানে প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে ধুঁকছে, সেখানে দেশি কিংবা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা নতুন করে দেশে মূলধন খাটানোর কোনো ঝুঁকি নেবেন না। আর্থিক খাতের মূল্যায়ন তুলে ধরে ট্রাস্ট ব্যাংক জানিয়েছে যে, স্রেফ গ্যাস সংযোগ না পাওয়ার অজুহাতে হাজার কোটি টাকার আমদানি করা দামি কারখানা-যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর ধরে অলস বসে আছে। শুধু একটি ব্যাংকেরই এমন ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ আটকে আছে, যা সময়মতো সচল হতে না পারলে চূড়ান্তভাবে খেলাপি ঋণে পরিণত হবে এবং পুরো ব্যাংকিং খাতে একটি বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাবে।
তথ্যসূত্র: সমকাল