শিরোনামঃ
রাষ্ট্রপতিকে আইনের আওতায় আনা যায় না, এটা ‘ভুল কনসেপ্ট’: আখতার হোসেন ‘১৭ বছরের ত্যাগ-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে ছাত্রদল’ ইরান ইস্যুতে ‘প্রকাশ্য’ সমঝোতায় অস্বীকৃতি হোয়াইট হাউসের আসমানী মুসিবত এড়ানোর জন্য ১০টি পরামর্শ চলতি অর্থবছরে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শন, ২ চিকিৎসককে বরখাস্ত আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গড়তে সরকার বদ্ধপরিকর : প্রধানমন্ত্রী চাকরি না খুঁজে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলুন: নবীন শিক্ষার্থীদের ফখরুল ‘পুরস্কার ও তিরস্কার’ নীতি অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাসপাতালেই ছড়াচ্ছে প্রাণঘাতী সংক্রমণ
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩২ পূর্বাহ্ন

দেড় বছরে নতুন কোটিপতি ৭ হাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্পকালীন শাসনামলে দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যক্তি শ্রেণীর কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের (অ্যাকাউন্ট) সংখ্যায় অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন উল্লম্ফন দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি ব্যক্তিগত হিসাবের সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজারের ঘরে। কিন্তু মাত্র দেড় বছর পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগমুহূর্তে এই ধরনের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা সাড়ে ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। সে হিসাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে দেশে ব্যক্তি শ্রেণীর ‘মাল্টিমিলিয়নেয়ার’ ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা সাত হাজারেরও বেশি বেড়েছে, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে ধনিক শ্রেণীর এই দ্রুত বিকাশকে চরম অস্বাভাবিক ও রহস্যজনক বলে মনে করছেন আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশ করা ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে ১৭ ফেব্রুয়ারি এই সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যাংকগুলোতে ১ কোটি বা তার বেশি টাকা জমা থাকা ব্যক্তি শ্রেণীর হিসাব সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৬২৯। মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের মার্চ শেষে এই ধরনের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৬৪৫-এ। অর্থাৎ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে কোটি টাকার বেশি থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ দশমিক ৮৬ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, এই সময়ে দেশে সামগ্রিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রবৃদ্ধির হারের চেয়েও মাল্টিমিলিয়নেয়ার ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা অনেক বেশি হারে বেড়েছে। বর্তমানে দেশে কোটি বা তার বেশি টাকার মোট ব্যাংক হিসাবের এক-পঞ্চমাংশই বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই সৃষ্টি হয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে গড়ে ওঠা অলিগার্ক, লুটেরা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের বড় অংশ দেশ থেকে পালিয়ে যায়। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চোখে পড়ার মতো স্থবিরতা ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে এই সময়ে দেশে দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। এই ধরনের প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে মাত্র দেড় বছরে কোটি টাকার বেশি থাকা ব্যক্তি শ্রেণীর ব্যাংক হিসাব এক-পঞ্চমাংশ বেড়ে যাওয়াকে অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে করছেন আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টরা। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ সম্পর্কে এক চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর মতে, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের হাট-মাঠ, রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব নতুন এক শ্রেণীর হাতে চলে যায়। রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ব্যবস্থায়ও নতুন নিয়ন্ত্রক তৈরি হয়। সেই সময় ব্যাংকগুলোতে এত পরিমাণ নতুন কোটি টাকার হিসাব তৈরি হওয়ার পেছনে ক্ষমতার এই হাতবদল ও নতুন চাঁদাবাজ শ্রেণীর উত্থানের প্রভাব থাকতে পারে।

পুলিশের এক প্রতিবেদনের তথ্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তার এই পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, চাঁদাবাজি-দখলবাজির ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের ৫৭ শতাংশই ছিল একেবারে নতুন অপরাধী, যাদের অতীতে এই ধরনের কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না। অর্থাৎ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অপরাধ ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনকারী অনেক নতুন চেহারার উদয় হয়েছিল, যাদের অর্থ হয়তো ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাবে জমা হয়েছে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কোটি টাকার হিসাব এত বেড়ে যাওয়ার পেছনে সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্বল ব্যাংকগুলো থেকে ভালো ব্যাংকে আমানত স্থানান্তরের বিষয়টিকে একটি কারণ হিসেবে মনে করছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে আসায় সুশাসনের ঘাটতি থাকা ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ওই ব্যাংকগুলো থেকে একসঙ্গে অনেক এফডিআর ভেঙে ভালো ভাবমূর্তির ব্যাংকে নিয়ে জমা করেছে, এতে কোটি টাকার হিসাব বাড়তে পারে। এনবিআর, দুদকসহ অন্যান্য সংস্থার তৎপরতার কারণে মানুষ নগদ টাকা বাসায় না রেখে ব্যাংকে রেখেছে, এমন ধারণাকেও তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠা বিভিন্ন অংশের হঠাৎ অতিধনী হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকেও তিনি কিছুটা সত্য বলে মনে করেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধান্দাবাজি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এগুলোর হাতবদল হয়েছে, নতুন কিছু লোক নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে, যারা ব্যাংকে টাকা রাখায় কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়তে পারে।

যদিও সাবেক অর্থ উপদেষ্টার ধারণা অনুযায়ী মানুষ ঘরে থাকা নগদ টাকা ব্যাংকে জমা করেছেন—এমন ধারণাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য সমর্থন করে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যাংকগুলোর বাইরে তথা মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে ব্যাংকের বাইরে থাকা এই নগদ অর্থের পরিমাণ কমেনি। উল্টো এই সময়ে জনগণের হাতে থাকা নোটের স্থিতি বেড়ে চলতি বছরের মার্চ শেষে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে কোটি টাকার ব্যক্তি শ্রেণীর ব্যাংক হিসাবগুলোতে জমাকৃত আমানতের স্থিতি ছিল ৮৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। দেড় বছর পর চলতি বছরের মার্চে আমানত স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়। তবে ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ নির্বাহীরা জানান, দেশের প্রকৃত ধনিক শ্রেণীর গ্রাহকরা সচরাচর এক ব্যাংক হিসাবে কখনো কোটি টাকার আমানত ফেলে রাখেন না। কোটিপতিরা কর ফাঁকি বা হয়রানির ভয়ে ৫-১০ লাখ টাকা করে বিভিন্ন ব্যাংকে বহু মেয়াদি আমানত হিসাবে অর্থ জমা করেন। আবার ধনিক শ্রেণীর একটি বড় অংশ উপার্জিত অর্থ দ্রুত বিদেশে পাচার করে দেন। এই পরিস্থিতিতে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দেশে কোটি টাকার একক ব্যাংক হিসাব বাড়ার অর্থ হচ্ছে, এই কোটিপতিদের বড় অংশই নতুন অর্থের মালিক। তারা হঠাৎ অল্প সময়ে অবৈধ উপায়ে বা ক্ষমতার জোরে এই অর্থ হস্তগত করেছেন এবং সেটাই দ্রুত ব্যাংকে জমা রেখেছেন।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এই কোটিপতি বাড়ার পেছনে দুর্নীতি বহাল থাকাকে কারণ হিসেবে মনে করছেন। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতির ধরনে বদল এলেও দুর্নীতি আগের মতোই ছিল। নীতি-নৈতিকতা ছাড়াই অনেকে আয় করেছে। সে সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা টাকা আয়ের বেশি সুযোগ পেয়েছিল, এখনো তারাই পাচ্ছে। যারা দুর্নীতি করে কোটিপতির তালিকায় নাম লেখাচ্ছে, তাদের ধরা উচিত। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী হঠাৎ ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠা শ্রেণীর ব্যাংক হিসাব বাড়ার ঘটনাকে স্বাভাবিক মনে করেন। তিনি বলেন, দেড় দশক পর ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিবর্তন আসায় একেবারে নতুন কিছু মানুষ ক্ষমতাশালী হয়েছিলেন, তাদের অনেকে এখন ব্যবসা-বাণিজ্যে নাম লিখিয়েছেন। এর পেছনের কারণ হিসেবে এই ঘটনাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তবে বিনিয়োগ খরা ও দুর্বল ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ভালো ব্যাংকে রাখাও এর কারণ হতে পারে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া এই তথ্য সত্য হয়ে থাকলে এটি নির্মোহ বিশ্লেষণ ও তদন্তের দাবি রাখে। প্রশাসন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিষয়ে তদন্ত করা উচিত। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রবণতার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তি শ্রেণীর কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়তে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে কঠোর পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের আওতায় এনেছে। কোনো ব্যাংকে সামান্যতম অনিয়ম ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোটি টাকার হিসাব বাড়ার ক্ষেত্রে কালো টাকার প্রভাব থাকলে সেটিও চিহ্নিত করা হবে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...