শিরোনামঃ
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৩২ পূর্বাহ্ন

জামায়াত নেতৃত্বাধীন এগারো দলীয় জোটে ভাঙনের সুর

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা ও বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নির্বাচনকালীন গঠিত এই জোটের অন্যতম প্রধান শরীক খেলাফত মজলিস সম্প্রতি এক ঘোষণা দিয়ে জোটের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর আগে গত বছরের জুন মাসেই বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও একই ধরনের অবস্থান স্পষ্ট করে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। অন্যদিকে এই টানাপোড়েনের মধ্যেই কওমিভিত্তিক সাতটি রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার নিচে আনার জন্য একটি বিশেষ সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে হেফাজতে ইসলাম। এই ঘটনাগুলো জামায়াতের রাজনৈতিক অক্ষকে একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। যদিও জামায়াতে ইসলামী দাবি করছে যে জোটে কোনো ধরনের ফাটল ধরেনি এবং হেফাজতের উদ্যোগের পেছনে সরকারের ষড়যন্ত্র রয়েছে, তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে শরীক দলগুলোর মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ ও অসন্তোষ জোটের সংহতিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।

ঢাকা রাজধানীর কাকরাইলে অনুষ্ঠিত খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সভা থেকে জোটগত কর্মসূচি এড়িয়ে চলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি আসে। বৈঠক শেষে দলটি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে জানায় যে, মূলত ১১ দলীয় জোটে অংশগ্রহণ ছিল একটি বিশেষ ‘নির্বাচনী সমঝোতা’ এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার সাথেই সেই সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জুলাই বিপ্লব সংক্রান্ত কয়েকটি কর্মসূচিতে তারা সম্মিলিতভাবে অংশ নিলেও এখন থেকে দলটি নিজেদের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক গতিপথ অনুযায়ী কর্মসূচি পালন করবে। তবে দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, এই দূরত্ব তৈরির পেছনে মূল কারণ কেবল নির্বাচনী মেয়াদ শেষ হওয়া নয়। বরং জাতীয় নির্বাচনের সময় কাঙ্ক্ষিত আসন ভাগাভাগি না পাওয়া, সংরক্ষিত নারী আসন বন্টনে তাদের বঞ্চিত করা এবং জোটের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ সম্মান না পাওয়ার কারণে শরীকদের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। তা ছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাও শরীকদের সরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।

একই ধরনের অসন্তোষ থেকে জোট ছাড়ার পথ ধরেছিল অপর শরীক দল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকেই তারা নিজেদের আর এই জোটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে না। এমনকি জামায়াতকে তারা অনুরোধ জানিয়েছে যাতে জোটের যেকোনো সংবাদ বা কর্মসূচিতে তাদের দলের নাম আর ব্যবহার করা না হয়। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের অভিযোগ, নির্বাচন গঠনের শুরু থেকেই জামায়াতে ইসলামী তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে একতরফা নীতি অনুসরণ করে এসেছে। শরীক দলগুলোর মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে একক সিদ্ধান্তে রাজপথের কর্মসূচি নির্ধারণ করা হতো। বারবার আপত্তি জানানোর পরও জোটের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাদের দলের নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে দলটি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ফলে আসন সমঝোতায় অবমূল্যায়ন এবং নীতিগত দ্বন্দ্বে তাদের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

জোটের এই অভ্যন্তরীণ সংকটের মাঝেই হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমিভিত্তিক সাতটি ইসলামী দলকে একত্রিত করার নতুন প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজত আমীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এই বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, কওমি ধারার শরীকরা নীতিগতভাবে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। হেফাজত নেতৃত্বের মতে, নির্বাচনের সমীকরণে কওমি শক্তির ভেতরে যে সামাজিক বিভাজন তৈরি হয়েছিল, তাকে দূর করে পুনরায় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করাই এই উদ্যোগের একমাত্র উদ্দেশ্য। যদিও এখনো নতুন কোনো রাজনৈতিক জোট গঠনের ঘোষণা আসেনি, তবে আগস্টের শুরুতে দলগুলোর পক্ষ থেকে লিখিত প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

তবে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের রাজনৈতিক জোটে ভাঙনের এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জোটের প্রধান সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেছেন যে, ১১ দলীয় জোটে কোনো সংকট নেই এবং এটি আগের মতোই কার্যকর রয়েছে। তাঁর মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, খেলাফত মজলিস বা খেলাফত আন্দোলন কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ত্যাগ করার কথা বলেনি, তারা কেবল সাময়িকভাবে কর্মসূচিতে না থাকার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে হেফাজতের সাত দলীয় বৈঠককে তিনি একটি ‘সরকারি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন যে, সরকারবিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এই ধরনের মেরুকরণ তৈরি করা হচ্ছে।

জামায়াতের এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকার অপচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে হেফাজত ও খেলাফত মজলিস। হেফাজত নেতারা পাল্টা জবাবে জানিয়েছেন, কওমি শক্তির এই ঐক্যের পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা সরকারি এজেন্ডা নেই। শরীকদের ধরে রাখতে না পেরে নিজেদের সাংগঠনিক ব্যর্থতা ঢাকতেই জামায়াত সরকারের ওপর দায় চাপানোর রাজনীতি করছে। অন্য দলগুলোও জানিয়েছে যে, ইসলামবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কওমি দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় আনাই ছিল মূল লক্ষ্য। সরকারের অপকৌশল নয়, বরং নিজেদের ভেতরে অবমূল্যায়ন ও একপক্ষীয় আচরণের কারণেই শরীকরা সরে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে আসন বন্টনের জের ধরে তৈরি হওয়া অবিশ্বাসের ফাটল এখন এক বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নিয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার


এ জাতীয় আরো খবর...