শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন

গ্যাস সংকট: দিনের বদলে রাতে চালছে অনেক কারখানা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার এবং চট্টগ্রামের শিল্প এলাকাগুলোতে দিনে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসায় স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ও অর্ডার অনুযায়ী বায়ারদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছে দিতে অনেক তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা দিনের শিফট পুরোপুরি বন্ধ বা সীমিত রেখে রাতের বেলায় কাজ চালু রাখার চেষ্টা করছে। তবে রাতের শিফটেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গ্যাসের চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন স্বাভাবিক হচ্ছে না। ফলে রপ্তানি আদেশের জাহাজীকরণ বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে কারখানা মালিকদের।

ফতুল্লা, সাভার ও গাজীপুর এলাকার ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং কারখানাগুলোতে মূলত বয়লার সচল রাখতে না পারায় কাপড়ের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। স্বাভাবিক কারখানা পরিচালনার জন্য পাঁচ থেকে আট পিএসআই গ্যাসের চাপের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে শূন্য থেকে এক পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে। গাজীপুরের সালেক টেক্সটাইল, সিপিএম ওয়াশিং ও মাহমুদ ডেনিমসের মতো বৃহৎ কারখানাগুলোতে উৎপাদন ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। গ্যাসের এই অপ্রতুলতার কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনগুলো থেকেও পর্যাপ্ত সিলিন্ডার সংযোগ না পাওয়ায় বিকল্প উপায়ে শিল্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখতে দেশের বহু কারখানা মালিক এখন বাধ্য হয়ে ডিজেল ও এলপিজির মতো অত্যধিক ব্যয়বহুল বিকল্প শক্তি ব্যবহার করছেন। এতে প্রতি কারখানায় দৈনিক লাখ লাখ টাকা অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ বাবদ অপচয় হচ্ছে, যা তাদের লাভ তো দূরের কথা, মূল মূলধনকেই ধসিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ফিনিশিং এবং আয়রন করতে না পারায় পোশাক প্যাকিং করে বন্দরে পাঠানোর কাজ থমকে গেছে। বছরের শেষ দিকে বিদেশি বায়ারদের বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও এই ধরনের অস্থির পরিস্থিতি বজায় থাকলে তারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে। ইস্পাত ও রাসায়নিক শিল্পের কাঁচামাল তৈরিতে গ্যাসের পর্যাপ্ত প্রেসার না থাকায় উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভারী শিল্পগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পেলে বিলেট বা অন্যান্য উপাদান সঠিকভাবে তৈরি করা সম্ভব হয় না। এতে উৎপাদন অনেকাংশে কমে গেলেও গ্যাস কোম্পানিগুলোর নিয়মিত বিল ঠিকই মেটাতে হচ্ছে। বাণিজ্যিক রিফাইনারি এবং রাসায়নিক কারখানাগুলোর বেশ কয়েকটি ইউনিট ইতিমধ্যে আংশিক বা পুরোপুরি কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন স্থানীয় বাজারের সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধেও চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা।

গ্যাসের তীব্র সংকটে বাধ্য হয়ে রাতে কাজ শুরু করা উদ্যোক্তাদের জন্য এক ধরনের অস্থায়ী টিকে থাকার লড়াই মাত্র। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন যে, দীর্ঘদিন নাইট শিফটে কারখানা চালানো কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না, কারণ অধিকাংশ শ্রমিকই রাতে একটানা কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অধীনস্থ এলাকাগুলোতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। মূলত একটি এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি জটিলতার কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও কারখানাগুলোতে দ্রুত সময়ে চাপ বাড়ানোর সুযোগ থাকছে না।

শিল্পে এই তীব্র গ্যাস সংকটের প্রভাব যদি আর কিছুদিন অব্যাহত থাকে, তবে জাতীয় রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধস নামবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে বড় অঙ্কের শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামোগত ত্রুটি দ্রুত মেরামত করে সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় চাপের গ্যাস জোগান দেওয়া ছাড়া বর্তমান এই গভীর মন্দা কাটানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন জাতীয় অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...