শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৫ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বৃদ্ধিতে দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক, কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত প্রভাব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ভারতের প্রবীণ কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নেতৃত্বে গঠিত এই উচ্চপর্যায়ের স্থায়ী কমিটি সম্প্রতি ভারতীয় সংসদে উত্থাপিত তাদের বিশেষ রিপোর্টে এই পর্যবেক্ষণের কথা স্পষ্ট করেছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশে ভারতের প্রতিপক্ষ বা অবান্ধব দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়লে তা ভারতের নিজস্ব ভৌগোলিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় সরাসরি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই ঢাকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রতিবেশী হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অবকাঠামো, অর্থনৈতিক এবং যৌথ উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত করার জোর সুপারিশ জানিয়েছে এই কমিটি।

ভারতের এই সংসদীয় প্যানেল সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করেছে যে, বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক কেন্দ্র মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে একাধিক প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সম্পৃক্ততা অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের শুরুর দিকে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীন বিপুল অঙ্কের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন করে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক সীমানার অত্যন্ত কাছে লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির উন্নয়নকাজ এবং বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী পেকুয়ায় আটটি সাবমেরিন নোঙর করার সুবিধাসম্বলিত আধুনিক ঘাঁটির উপস্থিতিকে ভৌগোলিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে দিল্লি। যদিও বাংলাদেশের সেনা কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে এই মুহূর্তে লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি, তবুও শিলিগুড়ি করিডোর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সুরক্ষার স্বার্থে একে বেশ গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।

ভারত স্বীকার করেছে যে, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে যেকোনো দেশের সঙ্গেই অর্থনৈতিক বা সামরিক চুক্তি সম্পাদনের পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। তবে প্রতিবেশী হিসেবে ভারত তার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আঞ্চলিক পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখবে। রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, চীনের সাথে ঢাকার এই ঘনিষ্ঠতা কেবল অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত চুক্তিগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সাথেও বেইজিং তাদের সম্পর্কের পরিধি বিস্তৃত করছে। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদলের চীন সফরকে এই বিস্তৃত রাজনৈতিক সম্পর্কের উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি।

চীনে তৈরি প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত বলয় মোকাবিলায় ভারতের প্রধান শক্তি হলো প্রতিবেশী হিসেবে তুলনামূলক ভৌগোলিক সুবিধা ও দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারত্ব। ভারত এই সম্পর্ককে আরও অর্থবহ করতে খুলনা-মোংলা ট্রেন চলাচলের সুযোগ এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের ট্রানজিট সুবিধার কথা উল্লেখ করেছে। কমিটি মনে করে, প্রযুক্তি, ঋণ সহায়তা ও দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভারত যদি ঢাকার কাছে নিজেদের বিকল্প ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে তুলে ধরতে পারে, তবে বাহ্যিক যেকোনো শক্তিকে ছাপিয়ে দুই দেশের যৌথ সুসম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।

এর পাশাপাশি সীমান্তে চোরাচালান, মৌলবাদের উত্থান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং মানবপাচারের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আরও কঠোর ও আধুনিক নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে এই সংসদীয় প্যানেল। সীমান্ত এলাকাগুলোতে আধুনিক ড্রোন, নাইট ভিশন থার্মাল ক্যামেরা, সেন্সর প্রযুক্তি এবং উপগ্রহভিত্তিক মনিটরিং চালুর পাশাপাশি সীমান্ত সংলগ্ন জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার সংকট দূর করে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত জোট গঠন করার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন দেশটির নীতিনির্ধারকেরা।

তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড


এ জাতীয় আরো খবর...