শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৫ পূর্বাহ্ন

অচল কারখানার বিশাল ভূসম্পত্তিতে চোখ দেশি-বিদেশি বড় পুঁজির

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরে খসে পড়ছে পলেস্তারা, আবার কোথাও বিশাল শিল্পভূমির ওপর গজিয়ে উঠেছে অবৈধ বসতি ও ঝোপঝাড়। দেশের শিল্পায়নের সূচনালগ্নে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রায়ত্ত বহু কারখানা লোকসান, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক দখলের খপ্পরে পড়ে একে একে অচল হয়ে যায়। বিগত সরকারের সময়ে চালু করার দোহাই দিয়ে তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের নামে নামমাত্র মূল্যে এসব মূল্যবান সরকারি জমি দীর্ঘমেয়াদে লিজ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কারখানা গড়ে ওঠেনি। বরং শত শত একর জমি ফেলে রেখে ব্যক্তিগত বাণিজ্য বা মাটির ব্যবসা চালানো হয়েছে। এবার এই বিশাল সরকারি শিল্পসম্পদ ও জমি পুনরুদ্ধার করে নতুন উৎপাদনে ফেরাতে ৪৪টি অলাভজনক কারখানার একটি বিশেষ বিনিয়োগ পোর্টফোলিও তৈরি করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)।

বিডার নথিপত্র অনুসন্ধান করে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত এই ৪৪টি বন্ধ ও অসুস্থ প্রতিষ্ঠানের অধীনে দেশের বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার একরের বেশি তৈরি শিল্পজমি। বিদ্যুৎ, গ্যাস, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিশালাকার অবকাঠামো তৈরি থাকায় নতুন করে জমি অধিগ্রহণের ঝামেলা ছাড়াই এগুলো সরাসরি বিনিয়োগের উপযোগী বা ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ অবস্থায় রয়েছে। ইতোমধ্যে এই সুবিধা কাজে লাগাতে চীনের জিরো জিয়াম, জার্মানির সাইন প্লাস এবং দেশের প্রাণ-আরএফএল, আকিজ, এসিআই, ট্রান্সকম ও নাবিল গ্রুপের মতো একাধিক বিশ্বখ্যাত ও দেশীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অলাভজনক এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে বা যৌথ অংশীদারিত্বে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে যে, বিগত সাড় ১৫ বছরে শিল্প চালুর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে মূলত সরকারি জমি দখলের উৎসব চলেছে। কর্ণফুলী পেপার মিলসের খালি জমি পর্যটনের নামে হস্তগত করে কোনো কাজই করেনি স্থানীয় সাবেক এমপির ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক গোষ্ঠী। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আমিন জুট মিলের প্রায় ২২ একর জমি দখল করে সেমিপাকা ঘর বানিয়ে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় সাবেক আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর মোবারক আলী ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে রাজশাহীর সাবেক মেয়রের ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট রাজশাহী টেক্সটাইল মিলসের জমি দখল করে রাখে। একইভাবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সাবেক দুই মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী ও গোলাম দস্তগীর গাজীর বিরুদ্ধে যথাক্রমে কোনো দরপত্র ছাড়া নামমাত্র ২৩ লাখ টাকায় কোটি টাকার জমি বিক্রি এবং সরকারি ও ব্যক্তিগত শিল্পজমির জবরদখল ও অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সিআইডি ও দুদকের মামলা চলছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে চট্টগ্রামের প্রাচীন উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি এবং ঐতিহ্যবাহী আমিন জুট মিলে গিয়ে দেখা গেছে ভুতুড়ে নীরবতা। কোটি কোটি টাকার পুরোনো যন্ত্রপাতিতে জং ধরে জাল বুনেছে মাকড়সা। আমিন জুট মিলের সীমানাপ্রাচীর না থাকায় বেদখল হওয়া ভূসম্পত্তি নিয়ে আদালতে বর্তমানে ৬১টি মামলা ঝুলছে। দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকল ও পাবনা সুগার মিলেও একই ছবি স্পষ্ট। মাড়াই বন্ধ থাকায় শত শত একর জমি ও কারখানা প্রাঙ্গণ ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে, যেখানে রাত নামলেই বিষধর সাপের ভয় থাকে বলে নিরাপত্তারক্ষীরা জানান। কারখানা চালুর কোনো লক্ষণ না থাকলেও সেতাবগঞ্জ মিলের জমি লিজ দেওয়া ও মাটি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে, যা নিয়ে এলাকার কৃষক ও বেকার শ্রমিকদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধ কারখানা দ্রুত চালু করা প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলেও এর পেছনে রয়েছে নানা বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় এসব কারখানার ওপর চেপে রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া দেনা ও আইনি জটিলতা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, অতীতে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় লিজ দেওয়ার দরুন উদ্যোগগুলো আলোর মুখ দেখেনি। এবার কেবল জমি বা লিজ হস্তান্তর নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) নীতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি সম্পদের এই বিশাল উদ্ধার অভিযান আবারও আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে আটকে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি থেকে যাবে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


এ জাতীয় আরো খবর...