শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৫ পূর্বাহ্ন

মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে মূল্যস্ফীতি: প্রান্তিক কৃষক থেকে ভোক্তার হাতে যেতে চালের দাম দ্বিগুণ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

দেশের কৃষিভিত্তিক খাদ্যপণ্যের বাজারে উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ায় দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে উপস্থাপিত গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ক্ষেত্রবিশেষে চালের দাম কৃষকের বিক্রি করা দরের চেয়ে খুচরা বাজারে প্রায় শতভাগ বা দ্বিগুণ পর্যন্ত হয়ে যায়। রাজধানীর একটি মিলনায়তনে আয়োজিত ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক এই বিশেষ আলোচনায় প্রকাশ করা হয় কীভাবে বাজারব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি সাধারণ ভোক্তার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে একজন কৃষক যে মাঝারি মানের ধান বা চাল প্রতি কেজি ত্রিশ টাকার কিছু বেশি দরে বেপারির কাছে হস্তান্তর করেন, শহুরে পাইকারি বাজার ও অটো রাইস মিলারদের হাত ঘুরে খুচরা দোকানে তা পৌঁছাতে প্রায় ষাট টাকায় ঠেকে। এই পুরো সরবরাহ প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর বৃদ্ধি পায় বেপারি ও মিল মালিকদের মধ্যবর্তী ধাপে, যেখানে কাঁচা ধান প্রক্রিয়াজাত করে চালে রূপান্তরিত করা হয়। চাল ছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও একই বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়েছে। পেঁয়াজ, আলু, বেগুন এবং ডালের দাম কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত যেতে পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকের কোঠায় বাড়ে, আর কাঁচামরিচের মতো পচনশীল পণ্যে এই দর বৃদ্ধির হার একশত ষোল শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

সিপিডির বিশদ বিশ্লেষণ বলছে, পণ্য পৌঁছানোর পথ বা সরবরাহ শৃঙ্খল যত দীর্ঘ হয় এবং মাঝপথে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যক্তির সংখ্যা যত বাড়ে, ভোক্তাপর্যায়ে সেই পণ্যের দাম তত আশঙ্কাজনকভাবে লাফিয়ে বাড়ে। এর বিপরীতে মুরগি, ডিম, গরুর মাংস কিংবা মাছের মতো যেসব খাদ্যে পাইকার বা মধ্যস্থতাকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম, সেখানে দামের তারতম্য দশ থেকে পঁচিশ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আলুর মতো বহু খাদ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা প্রায় ৮০ শতাংশই নির্ভরশীল থাকেন শহরাঞ্চলের অল্প সংখ্যক আড়তদারদের ওপর। এই একমুখী নির্ভরতা বাজারে হাতে গোনা কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর একক প্রভাব তৈরি করে, যা কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি এবং সাধারণ ক্রেতাদের পকেট কাটার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

সংলাপে অংশ নেওয়া আইনপ্রণেতা ও বিশেষজ্ঞরা জানান, বৈশ্বিক মহামারী পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও বাংলাদেশে অতিরিক্ত লজিস্টিক খরচের কারণে নিত্যপণ্যের দর উচ্চস্তরেই আটকে আছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয় হিসেবে ধরা হলেও বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। তাছাড়া পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি, উপযুক্ত কোল্ড-চেইন বা হিমাগারের অভাব এবং বাজারের সঠিক তথ্যের ঘাটতি কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কৃষি বিপণন ও প্রতিযোগিতা কমিশনের তদারকি জোরদার করে প্রতিদিনের পাইকারি ও খুচরা দর প্রকাশ্যে টাঙিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খল সংক্ষিপ্ত করার জোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

খাদ্যমূল্যস্ফীতির এই লাগামহীন দৌড় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে নিম্ন আয়ের সাধারণ পরিবারগুলোকে, কারণ তাদের আয়ের প্রধান অংশই ব্যয় হয়ে যায় দৈনন্দিন আহার সংস্থানে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল সরকারি ভর্তুকি বা সাময়িক তদারকি দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়, বরং কৃষক ও সরাসরি বিক্রেতার সংযোগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। লজিস্টিক খরচ কমানো, অনানুষ্ঠানিক চাঁদা বন্ধ করা এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত স্বচ্ছতা বজায় রাখার সমন্বিত সরকারি পদক্ষেপ ছাড়া সাধারণ মানুষকে মূল্যস্ফীতির এই নির্মম কশাঘাত থেকে রক্ষা করা কঠিন হবে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...