বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত এবং পালিয়ে ভারতে অবস্থান নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে ঢাকা থেকে পাঠানো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে ভারত সরকার। ভারতের জাতীয় সংসদ বা লোকসভায় পেশ করা এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিবেদনে পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে কেন্দ্রীয় নরেন্দ্র মোদি সরকার। একই সঙ্গে নয়া দিল্লির নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার করে সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থানকালে শেখ হাসিনাকে কোনো ধরনের প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, বিবৃতি প্রদান কিংবা বাংলাদেশবিরোধী কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও এমন কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
ভারতের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ এবং ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সাম্প্রতিক বিশেষ প্রতিবেদনে লোকসভায় পেশকৃত এই রিপোর্টের বিস্তারিত তথ্য ও সুপারিশমালা প্রকাশ করা হয়েছে। কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য ও সাবেক আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ড. শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন পররাষ্ট্রবিষয়ক পার্লমেন্টারি স্থায়ী কমিটির সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে ভারত সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সংক্রান্ত এই নবম প্রতিবেদনটি সম্প্রতি লোকসভায় পেশ করা হয়। ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা সংশ্লিষ্ট বিচারব্যবস্থায় শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মামলা পরিচালনা ও মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার তাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান আইনি কাঠামো, প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক দ্বিপক্ষীয় নির্ধারিত প্রটোকল অনুসরণ করে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর এই আবেদন সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের আইনি ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে। একই সাথে, এ সংক্রান্ত পর্যালোচনার অগ্রগতি নিয়মিত সংসদীয় কমিটিকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
## আশ্রয় প্রদান এবং ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহারে কঠোর নীতি
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পেশ করা সরকারের ব্যাখ্যায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ঐতিহ্যগত অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারতের দীর্ঘদিনের একটি ‘সভ্যতাগত মূল্যবোধ’ এবং বিশ্বজনীন মানবিক নীতি রয়েছে। সেই মূল্যবোধ ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই গুরুতর জীবনঝুঁকি বা চরম রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকটে পড়া ব্যক্তিদের অতীতে ভারতের মাটিতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেই একই মানবিক নীতি প্রযোজ্য হয়েছে। তবে ভারতের নীতিনির্ধারকরা স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন, মানবিক আশ্রয় দেওয়া আর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারত শুরু থেকেই একটি অটল নীতি মেনে চলে—তা হলো ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ডকে অন্য কোনো বন্ধুভাবাপন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শত্রুভাবাপন্ন বা অস্থিরতামূলক রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর আখড়া বানাতে দেওয়া হবে না।
এর আগে ভারতের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন ওঠে যে শেখ হাসিনা ভারত থেকে বক্তব্য রেখে বা রাজনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে বাংলাদেশে নিজের অবস্থান ফেরানোর চেষ্টা করছেন। তবে ভারতের মোদি সরকার সংসদীয় কমিটিকে দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে, তাকে কোনোভাবেই এমন কিছু করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ভারত তার আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক অবস্থানের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য বজায় রেখে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে এই পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।
## ঢাকার আইনি অবস্থান ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই প্রত্যর্পণ ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আলোচনা এমন এক সময়ে গতি পেয়েছে যখন শেখ হাসিনা চলতি বছরের শেষ নাগাদ বা যেকোনো সময়ে বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এর পরপরই বিষয়টির আন্তর্জাতিক আইনি গুরুত্ব বিবেচনা করে ভারতের লোকসভা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এই ইস্যুতে বাংলাদেশে নিযুক্ত আইন কর্মকর্তা ও সরকারের প্রতিনিধিরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কিংবা দেশের প্রচলিত আদালতে সাজাপ্রাপ্ত বা পরোয়ানাভুক্ত অভিযুক্ত হিসেবে শেখ হাসিনা দেশে পা রাখামাত্রই তাকে আইনের আওতায় এনে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হবে।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। প্রাণ রক্ষার্থে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সেই আন্দোলনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে ঢাকার সাথে দিল্লির সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা শীতলতা ও দূরত্ব তৈরি হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলতি বছরের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত নতুন সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বিচারব্যবস্থা সুসংহত করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক তাগিদ অব্যাহত রেখেছে।
## জনগণের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিকের তাগিদ
ভারতের লোকসভায় জমা দেওয়া স্থায়ী কমিটির এই প্রতিবেদনে শুধু হস্তান্তরের আইনি দিকই আলোচনা করা হয়নি, বরং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঝুলে থাকা ও বৈরী দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে আবার স্থিতিশীল পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়েও একাধিক বৈপ্লবিক সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটি জোর দিয়ে বলেছে, সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার অজুহাতে ভারত বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য পর্যটক বা ট্যুরিস্ট ভিসা প্রদান স্থগিত করে দেয়। দীর্ঘদিন এটি বন্ধ থাকায় এবং প্রায় দুই বছর ধরে কেবল সীমিত জরুরি চিকিৎসা ও স্টুডেন্ট ভিসা চালু রাখার ফলে সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের মনে ব্যাপক ক্ষোভ ও নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের বিশেষজ্ঞ কমিটি মনে করে, এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দীর্ঘমেয়াদে দুই প্রতিবেশী দেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামাজিক সুসম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অবশ্য সীমান্ত ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর সম্প্রতি ২০২৬ সালের ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের জন্য আবারও ধীরে ধীরে নিয়মিত পর্যটক ভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংসদীয় প্যানেল এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা যত দ্রুত সম্ভব শতভাগ নিরসন করে দুই দেশের ‘পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটি’ বা জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে আরও উন্মুক্ত করতে হবে।
## গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের কথা বিশেষভাবে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে ত্রিশ বছর মেয়াদী যে ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার মেয়াদ চলতি ২০২৬ সালেই সমাপ্ত হতে যাচ্ছে। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হতে চলায় দুই দেশের কৃষি, নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কথা চিন্তা করে অবিলম্বে নতুন করে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি আলোচনা শুরু করার জন্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
কমিটি তাদের পর্যবেক্ষণে নির্দিষ্ট করে বলেছে, গত ৩০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীগুলোর স্বাভাবিক পানির প্রবাহে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ফলে নতুন চুক্তি বা বর্তমান চুক্তির নবায়ন করার সময় গঙ্গার বর্তমান প্রকৃত জলপ্রবাহের হালনাগাদ উপাত্ত এবং নদীর ভৌগোলিক পরিবর্তনগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি এই চুক্তি সম্পাদনে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহার রাজ্য সরকারের স্থানীয় ভৌগোলিক স্বার্থ ও পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় মোদি সরকারকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
## ধর্মীয় সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা
ভারতের পররাষ্ট্র স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি রক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি ভারতের পররাষ্ট্র নীতি ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে কোনো প্রকার অস্থিতিশীলতা যাতে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কে আঘাত হানতে না পারে, সে জন্য তদারকি বাড়ানো আবশ্যক।
একই সঙ্গে, দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সংঘটিত আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, যেমন চোরাচালান, মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং উগ্রবাদী মৌলবাদের প্রসার দমনে দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উচ্চপর্যায়ের তদারকি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ভারতের সংসদীয় প্যানেল মনে করে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে দুই দেশের শত্রুভাবাপন্ন কোনো গোষ্ঠী যেন সুবিধা নিতে না পারে, সে জন্য সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে অত্যন্ত কূটনৈতিক পেশাদারিত্ব, দূরদর্শিতা ও আন্তরিকতার সাথে সমাধান করতে হবে। সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার ঢাকার আবেদনকে আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনায় রাখা এবং তাকে ভারত থেকে রাজনীতি করতে না দেওয়ার সুস্পষ্ট বার্তা দিয়ে দিল্লি কার্যত বাংলাদেশের সাথে নতুন কূটনৈতিক পথ সুগম করার দিকেই হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।