এক সময়ের নেতিবাচক ভাবমূর্তি কাটিয়ে উঠে বৈশ্বিক রাজনীতি ও কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে পাকিস্তান। নব্বইয়ের দশক কিংবা একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যে দেশের ভিসার সিল পাসপোর্টে থাকলে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রবেশাধিকার পাওয়া কঠিন হয়ে উঠত, আজ সেই দেশটিকেই নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের প্রধান অংশীদার ভাবছে ব্রাসেলস ও ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল খাতায় যে নীতি বা আদর্শের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থই শেষ কথা, পাকিস্তানের এই পুনরুত্থান তারই এক অনন্য উদাহরণ। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান, আফগানিস্তানে সামরিক উপস্থিতি পরবর্তী পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সেনাবহিনীর প্রভাব পশ্চিমা নীতি নির্ধারকদের নতুন হিসাব কষতে বাধ্য করছে।
ইউরোপের বর্তমান ভৌগোলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট পাকিস্তানকে ভিন্ন মাত্রায় এনে দিয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্য রুটে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকির ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নতুন করে সাজাচ্ছে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এর বিপরীতে ইউরোপের ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ প্রকল্পের প্রভাব বিস্তারে পাকিস্তানের মতো কৌশলগত স্থানের গুরুত্ব অপরিসীম। ভারত মহাসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার মধ্যকার সংযোগ সেতু হওয়ার কারণে ইসলামাবাদকে এড়িয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বা দক্ষিণ এশিয়ায় একক কোনো দীর্ঘমেয়াদী নীতি প্রণয়ন করা পশ্চিমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান-ইইউ অষ্টম কৌশলগত সংলাপ এবং দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলো কেবল প্রথাগত বাণিজ্য আলোচনার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘ দিন ধরে জিএসপি প্লাস সুবিধার আওতায় ইউরোপে অগ্রাধিকারমূলক রপ্তানি সুবিধা পেয়ে আসলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সম্পর্কের পরিধি জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটালাইজেশন, নৌ-নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় রূপ নিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব এখন বুঝতে পেরেছে যে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমন করতে হলে কেবল একটি দেশকে কেন্দ্র করে নীতি নির্ধারণ করা সঠিক হবে না। ফলে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় পাকিস্তানের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়া পশ্চিমাদের জন্য সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
তবে এই অংশীদারত্বের পথে গণতন্ত্র, সুশাসন এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত পুরোনো বিতর্কগুলো পুরোপুরি মুছে যায়নি। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো এখনো রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে থাকে। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে যে, বিগত দুই দশকে তারা চরমপন্থী ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিশাল আর্থিক ও মানবিক মূল্য চুকিয়েছে। তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ও পর্যটন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে এবং দেশে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার পরিবর্তন অব্যাহত রয়েছে। তারা মনে করে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার কঠিন বাস্তবতার আলোকেই পশ্চিমা বিশ্বকে তাদের সামগ্রিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা উচিত।
পাকিস্তান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার এই নতুন রূপরেখা কেবল সাময়িক শুল্ক সুবিধা বা অর্থনৈতিক মুনাফার ওপর নির্ভর করবে না। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জর্জরিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায়, তবে পাকিস্তানকে জিএসপি প্লাসের বাধ্যবাধকতার বাইরে গিয়ে কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখতে হবে। সন্ত্রাসবাদ দমন, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা রক্ষায় পাকিস্তানের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ব্রাসেলস ও ইসলামাবাদ একটি স্থায়ী ভূরাজনৈতিক সেতু গড়ে তুলতে সক্ষম হবে, যা পুরো এশীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস