সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহের নির্ধারিত সময়সীমা ঘনিয়ে এলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া এবং খাদ্য গুদামগুলোতে নানামুখী অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে চরম হতাশা ও আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন দেশের ধান চাষিরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বাড়লেও প্রায় দেড় দশকের মধ্যে এবারই প্রথম ধানের সরকারি সংগ্রহ মূল্য এক টাকাও বাড়ানো হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি কেজি ধানের দর ৩৬ টাকা নির্ধারণ করায় প্রতি মণ ধানের সরকারি মূল্য দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৪০ টাকা। তবে মাঠপর্যায়ে খোলাবাজারে ধানের দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে প্রতি মণ ৮৫০ থেকে ১ হাজার টাকার নিচে নেমে গেছে। এর ওপর খাদ্য কর্মকর্তাদের ঘুষ দাবি, ভুয়া তালিকা, লটারিতে অনিয়ম এবং প্রকৃত কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনার কারণে সরকারের বাজার সুরক্ষামূলক এই কর্মসূচির সুফল থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ চাষিরা।
চলতি মৌসুমে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে সারা দেশ থেকে ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু দেশের অধিকাংশ জেলাতেই নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই ধান সংগ্রহ কার্যক্রম আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় খোলাবাজারে চালের দাম প্রায় ৯ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ধানের দামের ওপর। উৎপাদন খরচ না ওঠায় এবং ঘরে উদ্বৃত্ত ধান অবিক্রীত থাকায় সংসার চালানো ও আগের ঋণের দায় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন লাখ লাখ কৃষক পরিবার।
গাইবান্ধা জেলায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই খাদ্য বিভাগ ধান কেনা বন্ধ করে দিলে স্থানীয় বাজারে ধানের দামে চরম ধস নামে। জেলার হাটগুলোতে মোটা ধান প্রতি মণ মাত্র ৮৫০ টাকা এবং চিকন ধান ৯৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীরা লটারির তালিকায় নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে, অথচ প্রকৃত অনেক ধান চাষিকে তালিকায় রাখা হয়নি। এমনকি এমন অনেককে নির্বাচিত করা হয়েছে যাদের নিজেদের খাওয়ার মতোই ধান উৎপাদন নেই। জেলায় প্রায় ৯ লাখ টন উৎপাদনের বিপরীতে সরকারি সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি, যা খুব দ্রুত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শেষ করে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান দেওয়াকে কেন্দ্র করে ব্যাপক দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সেখানকার কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি ৩ টন ধান গুদামে জমা দেওয়ার জন্য ৩ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়েছে। এছাড়া লটারিতে নাম থাকা সত্ত্বেও বহু প্রকৃত কৃষকের ধান গ্রহণ না করে তাদের অর্থ অন্য ব্যক্তিরা তুলে নিয়েছে। সংগ্রহ তালিকার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃত ব্যক্তিদের নাম এবং এক কৃষকের নামের পাশে অন্য ব্যক্তির মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে অর্থ লোপাট করা হয়েছে। প্রায় ২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে খাদ্য গুদামে বারবার এসেও ধান বিক্রি করতে না পেরে অনেক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে কুষ্টিয়া, নওগাঁ ও দিনাজপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদনকারী জেলাগুলোতেও কৃষকদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ দেখা গেছে। কৃষকরা জানান, সার, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অতীতে যে সারের দাম ছিল ১৩ থেকে ১৬ টাকা, তা এখন ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজারে ধানের দর অত্যন্ত কম থাকায় চাষাবাদ আর লাভজনক পেশা হিসেবে টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে নওগাঁর মতো এলাকায় খাদ্য গুদামের দূরত্ব, পরিবহন খরচ এবং কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষমাণ রাখার ভোগান্তির কারণে অনেক কৃষক খোলাবাজারেই কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষি অর্থনীতিবিদ ও কৃষক সংগঠনের নেতাদের মতে, সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া এবং প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ব্যবস্থা না বাড়ালে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী এই কৃষক সমাজ চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।