শিরোনামঃ
ইমোশনাল উন্ড: বুকের মধ্যে ঘাতক কাঁটা বিমান টিকেট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: বিমানমন্ত্রী মানবাধিকার বিলের সিদ্ধান্ত ‘একতরফা’: বিরোধীদল বাংলাদেশ-চীনের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ শুরুর প্রস্তুতি জিম্মি থাকা কার্গো মুক্ত করলো তুরস্ক ও সোমালি বাহিনী, ১৪ জলদস্যু নিহত হাম উপসর্গে চারজনের মৃত্যু, নতুন রোগী দেড় হাজারের বেশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী গুমের আগে কোথায় কীভাবে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন, রোমহর্ষক বর্ণনা সাগর-রুনি হত্যায় এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রাথমিক সম্পৃক্ততা মিলেছে: চিফ প্রসিকিউটর জাতীয় ফুটবল দলের নতুন ম্যানেজার বাবু, কো-অর্ডিনেটর আমের
রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৪২ অপরাহ্ন

আবারও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কথা ভাবছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২৬ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

তীব্র গ্যাস ঘাটতি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থবিরতা এবং শিল্প-কারখানায় চলমান অচলাবস্থা কাটানোর অজুহাতে আবারও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কথা সক্রিয়ভাবে ভাবছে সরকার। জনবসতি, তিন ফসলি কৃষিজমি এবং অমূল্য ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদ ধ্বংসের মারাত্মক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সরকারের নীতিনির্ধারক মহল থেকে উন্মুক্ত খননের বিষয়টি নতুন করে নীতিগত বিবেচনায় আনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগের সঞ্চার হয়েছে। পরিবেশবাদী, বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের এই অবস্থানকে চরম আত্মঘাতী আখ্যা দিয়ে যেকোনো মূল্যে তা প্রতিহত করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন।
সম্প্রতি একটি জাতীয় সম্মেলনে সরকারের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে জানান যে, জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকার ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও খুব শীঘ্রই জাতীয় সংসদে দেশীয় কয়লা সম্পদ আহরণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা সংবলিত দশ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত জ্বালানি মহাপরিকল্পনা উপস্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার এবং পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও উন্মুক্ত খননের বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক পর্যালোচনা হয়েছিল, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখন প্রকাশ্যে রূপ নিতে যাচ্ছে।
তবে সরকারের এই অবস্থানকে সম্পূর্ণ গণবিরোধী এবং পরিবেশের জন্য চরম হুমকি বলে আখ্যা দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো নীতিনির্ধারক যদি মনে করেন অতীতে চুক্তি স্বাক্ষরের পর সাধারণ মানুষ সব ভুলে গেছে, তবে তারা মস্ত বড় ভুল করছেন। তিনি জানান, দেশের কোনো কয়লাক্ষেত্রই উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খননের উপযোগী নয় এবং স্থানীয় জনমতকে উপেক্ষা করে এমন কোনো প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে জনগণ তা কখনোই মেনে নেবে না।
ভূতত্ত্ববিদ ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের মতো একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ, কৃষিনির্ভর ও সংবেদনশীল ভূ-প্রকৃতির দেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার চিন্তা প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত দিক থেকে একেবারেই অসম্ভব। আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা প্রকল্প (আইএপি) এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের বিশদ গবেষণায় দেখা গেছে, ফুলবাড়ীতে মাটির উপরিভাগ কেটে খনি চালু রাখলে গভীর গহ্বরকে পানিশূন্য রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৮০ কোটি লিটার ভূগর্ভস্থ পানি পাম্প করে ফেলে দিতে হবে। এর ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পানির স্তর চিরতরে অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাবে এবং কৃষি সেচসহ সুপেয় পানির তীব্র আঞ্চলিক সংকট তৈরি হবে। ইতোমধ্যেই বড়পুকুরিয়ার ভূগর্ভস্থ খনির প্রভাবেই পার্শ্ববর্তী অন্তত ১৫টি গ্রামের মানুষ মিঠাপানির স্বাভাবিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন।
জাতিসংঘের এক মূল্যায়নে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খনি বাস্তবায়িত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হতে হবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতির শিকার হবেন দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি সাধারণ মানুষ। এর বাইরে দেশের অন্যতম প্রধান শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত প্রায় ১২ হাজার হেক্টর উর্বর কৃষিজমি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে, নিশ্চিহ্ন হবে অন্তত এক হাজার মৎস্য খামার এবং কেটে ফেলতে হবে প্রায় অর্ধলক্ষ ফলদ বৃক্ষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম উন্মুক্ত খননপদ্ধতিকে ভৌগোলিক বাস্তবতায় পুরোপুরি অকার্যকর উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দেশে প্রবল বর্ষা হয় এবং অতিরিক্ত উন্মুক্ত জায়গা একেবারেই নেই। খনি থেকে খুঁড়ে তোলা লাখ লাখ টন বিষাক্ত মাটি ও বর্জ্য ফেলার জন্য মূল খনির দ্বিগুণেরও বেশি অতিরিক্ত জায়গা প্রয়োজন। প্রবল বর্ষার মৌসুমে বিশাল এই গহ্বর একটি অনিয়ন্ত্রিত বিষাক্ত জলাশয়ে রূপ নেবে, যা আশপাশের সমগ্র অঞ্চলের মাটির ভূতাত্ত্বিক ভিত্তিকে চিরতরে ধসের মুখে ঠেলে দেবে। এই চরম পরিবেশগত ঝুঁকির কারণেই বিশ্বখ্যাত খনি প্রতিষ্ঠান বিএইচপি বিলিটন আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান বজায় রাখা অসম্ভব বিবেচনা করে এই প্রকল্প ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
বর্তমানে দেশের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মূলত আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভর করে চলছে। বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সদস্য সচিব হাসান মেহেদী জানান, উন্মুক্ত খনি থেকে কয়লা তুলে কোনো অর্থনৈতিক লাভ আসবে না। বর্তমানে বড়পুকুরিয়াতেই প্রতি টন কয়লা তুলতে যেখানে প্রায় ১৭৬ ডলার খরচ হচ্ছে, সেখানে বিশ্ববাজারে কয়লার দাম এখন অনেক কম। নতুন উন্মুক্ত খনির ক্ষেত্রে বিশাল জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের বিশাল দায় যুক্ত হলে দেশীয় কয়লার উৎপাদন ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়েও অনেক বেশি পড়বে।
বিশ্বজুড়ে যখন পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় কয়লাভিত্তিক জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে সবাই, তখন স্থানীয় পর্যায়ে এমন ধ্বংসাত্মক কয়লাখনির পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, কৃষিজমি ও প্রাণপ্রকৃতি ধ্বংস করে উন্মুক্ত খনির যেকোনো রাষ্ট্রীয় তৎপরতা শেষ পর্যন্ত দেশকে চরম পরিবেশ বিপর্যয় ও ব্যাপক সামাজিক অসন্তোষের দিকেই ঠেলে দেবে।
উল্লেখ্য, গেল ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলনের দিনটি পেরিয়ে গেল। ২০০৬ সালের সেই দিনে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন তিন তরুণ এবং আহত হয়েছিলেন বহু মানুষ, যার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধসহ ছয় দফা চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিল।
তথ্যসূত্র: নিউএজ


এ জাতীয় আরো খবর...