তীব্র গ্যাস সংকটে যখন দেশের শিল্প কারখানা স্থবির, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত এবং সার কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধের উপক্রম, তখন উন্মোচিত হয়েছে বিগত দেড় দশকের এক চরম নীতিগত অবহেলা ও আত্মঘাতী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের বাস্তব চিত্র। প্রায় আট বছর আগে ২০১৮ সালে মাত্র ৬০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে দ্বীপ জেলা ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসার যে সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রভাবশালী এলএনজি আমদানি লবির জোরদার তদবিরের বলি হয়ে বছরের পর বছর ফাইলবন্দি পড়ে থাকে। তৎকালীন সময়ে ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মিত হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ হতে পারত, যা বর্তমানের একটি বিশালাকার ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ সক্ষমতার সমান। অথচ সেই অত্যন্ত সাশ্রয়ী প্রকল্পকে ফেলে রাখার পরিণতিতে আজ সেই পাইপলাইন নির্মাণে জাতীয় কোষাগার থেকে সর্বনিম্ন সাড়ে তিন হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৯ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের বিশাল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকার যেসব মেগা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলোর উপযোগিতা নিয়ে এখন মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে। সাংহাইয়ের আদলে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ গড়ার চটকদার স্লোগান দিয়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল আজ সরকারের জন্য এক শ্বেতহস্তী প্রকল্পে রূপ নিয়েছে, যার দৈনিক টোল আদায় থেকে সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ খরচটুকুও উঠছে না। একইভাবে লাভজনক না হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও রিজার্ভের ‘বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল’ (বিআইডিএফ) থেকে অর্থ নিয়ে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর ও রাবনাবাদ চ্যানেল খননে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা, যার বিপরীতে বাণিজ্য কিংবা জাহাজ চলাচলের কোনো বাস্তব সুফল মিলছে না। অথচ মাত্র ৬০০ কোটি টাকার মতো নগণ্য বিনিয়োগে যে পাইপলাইনটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার লাইফলাইন হতে পারত, সেটিকে বছরের পর বছর ‘অর্থনৈতিক ঝুঁকি’ ও ‘অলাভজনক’-এর মিথ্যা তকমা দিয়ে স্থগিত রাখা হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি না করে আমদানিনির্ভর এলএনজি ব্যবসাকে প্রাধান্য দেওয়ার পেছনে সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। ২০১৮ সালে যখন ভোলার পাইপলাইনের খসড়া চূড়ান্ত হয়, ঠিক তখনই দেশে এলএনজি আমদানির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকেই স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের গতি থামিয়ে দিয়ে স্পট মার্কেট থেকে চড়া মূল্যে গ্যাস কেনার এক আত্মঘাতী চক্র চালু করা হয়। পেট্রোবাংলার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত আট বছরে কেবল এলএনজি আমদানিতেই দেশের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা, যার বিপরীতে সরকারকে আরও ৪৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল ভর্তুকির বোঝা টানতে হয়েছে। অথচ ভোলার স্থানীয় গ্যাস গ্রিডে আনতে পারলে এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি আজ চরম দেনার হাত থেকে রক্ষা পেত।
নীতিগত বৈপরীত্যের নজির এখানেই শেষ নয়; যেখানে গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই, এমন উত্তরাঞ্চলে সিরাজগঞ্জ-বগুড়া-রংপুর রুটে শত শত কোটি টাকা ঢেলে পাইপলাইন বসানো হয়েছে এবং কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থেকে খুলনার আড়ংঘাটা পর্যন্ত দীর্ঘ পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়ে বছরের পর বছর অলস বসিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ যে ভোলায় এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) উত্তোলনযোগ্য মজুত রয়েছে এবং সেখানে খনন করা প্রতিটি কূপে শতভাগ গ্যাস পাওয়ার বিরল রেকর্ড রয়েছে, সেই ভোলাকে মূল গ্রিড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। বাপেক্সের তথ্যমতে, বর্তমানে সচল কূপগুলো থেকে দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পূর্ণ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পাইপলাইনের অভাবে মাত্র ৭৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটেনি। তারাও ভোলা-বরিশাল-খুলনা মূল রুট পরিবর্তন করে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইনের নতুন প্রস্তাব এনে কালক্ষেপণ করে এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশি ঋণের শর্ত ও ঝুঁকির অজুহাতে প্রকল্পটি স্থগিত রাখে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভোলার গ্যাসকে ঘিরে একটি সমন্বিত দক্ষিণাঞ্চল উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভোলায় সার কারখানা, বড় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইলিশ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং একটি বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা।
বর্তমানে গ্যাসের প্রকট সংকট বিবেচনায় রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস সঞ্চালন সংস্থা জিটিসিএল ভোলা-বরিশাল-খুলনা রুটে মোট ২০৫ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের কাজ পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর প্রথম ধাপে ভোলা থেকে বরিশাল পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ২৪ ইঞ্চি পাইপলাইনের ডিপিপি প্রণয়ন চলছে এবং বরিশাল থেকে খুলনা পর্যন্ত ১০৯ কিলোমিটার অংশের জন্য রুট সার্ভে ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া গ্যাসের উত্তোলন আরও বাড়াতে ভোলায় বাপেক্স এবং একটি চীনা কোম্পানির মাধ্যমে আরও ১০টি নতুন কূপ খননের উদ্যোগ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, গ্যাসের প্রমাণিত মজুত থাকার পরও ভোলায় পাইপলাইন অলাভজনক হবে—এমন ভিত্তিহীন যুক্তি দেখিয়ে অতীতে বারবার জাতিকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। বর্তমানের উত্তাল বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং খোলাবাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজির উচ্চমূল্যের প্রেক্ষাপটে ভোলার গ্যাসকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করাই এখন সবচেয়ে কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী সমাধান। জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করে আমদানিকারক লবির স্বার্থে দেশীয় জ্বালানি সম্পদকে আটকে রাখার যে ঐতিহাসিক ভুল অতীতে করা হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুততম সময়ে এই পাইপলাইন নির্মাণ শেষ করাই এখন দেশের অর্থনীতি বাঁচানোর প্রধান দাবি।