রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আরও তিনটি নতুন মেট্রো রেল প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। তবে একই শহরে, একই রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির অধীনে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই মেগা প্রকল্পগুলোর প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয়ে দেখা দিয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। ভূগর্ভস্থ ও উড়াল পথের সমন্বয়ে তৈরি হতে যাওয়া এই তিনটি প্রকল্পের প্রতি কিলোমিটারের ব্যয়ে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই মেগা প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প তিনটির আওতায় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) মোট ৬৮.৪৪ কিলোমিটার মেট্রো রেল পথ নির্মাণ করবে। এতে সম্মিলিতভাবে সরকারের মোট ব্যয় হবে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৭ কোটি ২ লাখ টাকা, যা গড়ে প্রতি কিলোমিটারে ৩ হাজার ৬৪৯ কোটি ১৪ লাখ টাকার সমতুল্য। একই ধরনের অবকাঠামো হওয়া সত্ত্বেও ব্যয়ের এই বিপুল ফারাক এখন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের ভাবিয়ে তুলেছে।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে খরচের তারতম্য বিশ্লেষণ করলে এক বিস্ময়কর চিত্র ফুটে ওঠে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম খরচে নির্মিত হতে যাচ্ছে এমআরটি লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুটটি। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটটি নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড থেকে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা বিদেশি ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে। এই রুটটিতে ১৩.১০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ এবং ৪.১০ কিলোমিটার উড়াল পথ থাকবে। অর্থাৎ, এই প্রকল্পটির মোট পথের ৭৬.১৬ শতাংশই থাকবে মাটির নিচে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, তিনটি প্রকল্পের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পথের অনুপাত এই সাউদার্ন রুটে সবচেয়ে বেশি হওয়া সত্ত্বেও এর প্রতি কিলোমিটারের নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম। মূলত কোরিয়ান প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণেই এই রুটে খরচ অনেক সাশ্রয়ী হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া বাকি দুটি প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় আক্ষরিক অর্থেই বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত বিস্তৃত ৩১.২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকায়। এর ফলে এই রুটে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে খরচ পড়বে প্রায় ৩ হাজার ৬৬১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। অথচ ২০১৯ সালের অক্টোবরে একনেক যখন এই প্রকল্পটি অনুমোদন করেছিল, তখন এর আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল মাত্র ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং এটি ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর ব্যয় ১১৭.৬৪ শতাংশ বা ৬১ হাজার ৮৩৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রকল্প সমাপ্তির মেয়াদ ২০৩৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
একইভাবে, হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দান রুটের ব্যয় ১১৭.৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই রুটের ৬৭.৫০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ (১৩.৫০ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড এবং ৬.৫০ কিলোমিটার এলিভেটেড) হলেও এর ব্যয় সাউদার্ন রুটের চেয়ে অনেক বেশি। জাইকার অর্থায়নে পরিচালিত এই দুটি প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় এখন ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি এই প্রকল্পটির মেয়াদও ২০৩২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
নির্মাণ ব্যয়ের এই বিপুল পার্থক্যের কারণ ব্যাখ্যা করে একনেক সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি মূলত নির্মাণসামগ্রীর উৎস এবং বিদেশি অর্থায়নের কঠিন শর্তগুলোকেই এই ব্যয়ের ফারাকের জন্য দায়ী করেন। জাইকার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের শর্ত অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে জাপানি ঠিকাদার, পরামর্শক, বিক্রেতা এবং তাদের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী ব্যবহার করতে হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে কাজ করানোর কোনো সুযোগ থাকে না, যা প্রকল্প ব্যয় লাগামহীনভাবে বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া জাপান বর্তমানে তাদের ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি করছে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশোধিত ব্যয় অনুমোদন না করলে সুদের হার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। মূলত সেই চাপ এড়াতেই সরকার তড়িঘড়ি করে প্রকল্পগুলোর সংশোধিত ব্যয় অনুমোদন করতে বাধ্য হয়েছে বলে প্রতিমন্ত্রী জানান।
তবে ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়েও উদ্বেগ ছিল বলে জানা গেছে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকার যখন উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, তখন ইমেরিটাস অধ্যাপক শামীম-উয-জামান বসুনিয়ার নেতৃত্বাধীন একটি কারিগরি কমিটি এই সংশোধিত ব্যয়গুলো অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই করেছিল। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকার জন্য ভূগর্ভস্থ মেট্রো রেলের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু ভাড়ার আয়ের ওপর ভিত্তি করে মেট্রো রেলের লাভ-ক্ষতি হিসাব করা ঠিক হবে না। বরং ভ্রমণের সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়, যানজট হ্রাস এবং কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোর মাধ্যমেই এর প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হবে।
তবে সরকারের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারছেন না দেশের পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, শর্তযুক্ত ঋণ এবং সীমিত কেনাকাটার সুযোগ প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক জানান, একই শহরে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর মধ্যে নির্মাণ ব্যয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবধান অবশ্যই ব্যাখ্যার দাবি রাখে। বিশেষ করে যে রুটটিতে ভূগর্ভস্থ পথের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, সেটির নির্মাণ ব্যয় সবচেয়ে কম হওয়ার বিষয়টি একটি বড় বৈপরীত্য। তিনি বলেন, শর্তযুক্ত ঋণের কারণে ঋণদাতা দেশ থেকেই সব ধরনের ঠিকাদার, পরামর্শক ও যন্ত্রপাতি নিতে হয়, যার ফলে সরকার সেরা মূল্যে কাজ আদায় করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই বিপুল খরচের যৌক্তিকতা প্রমাণে সরকারকে তুলনামূলক একক ব্যয় বা কম্প্যারেবল ইউনিট কস্ট প্রকাশ করতে হবে এবং প্রকল্পগুলোর একটি স্বাধীন কারিগরি ও ভ্যালু-ফর-মানি পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিশাল অংকের এই ব্যয়ের কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও অর্থনীতিবিদরা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি দেশের জন্য প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা এক বিশাল অপরচুনিটি কস্ট বা বিকল্প সুযোগ ব্যয়ের সমতুল্য। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে ঋণদাতার সুদের হার আরও বেড়ে যেতে পারে—শুধুমাত্র এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করে এমন সব প্রকল্পের তাড়াহুড়ো করে অনুমোদন দেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়, যেগুলোর ব্যয় ইতিমধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পগুলোর নির্মাণ ব্যয় এভাবে লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সরকারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা সামাজিক সুরক্ষার মতো অন্যান্য অত্যন্ত জরুরি ও অপরিহার্য খাতগুলোতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।