বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫২ অপরাহ্ন

বিয়ে হয় দুটো পরিবারের মধ্যে

বাদল সৈয়দ / ১ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঘটনাটি আমি শুনেছিলাম একজন প্রবীণ মানুষের কাছ থেকে।

তিনি তাঁর এক বন্ধুর কথা বলেছিলেন। সে ভদ্রলোককেও আমি নামে চিনতাম। পাকিস্তান আমলের সিএসপি অফিসার। এক সময় খুব জাঁদরেল সচিব ছিলেন।

আমি যার কাছে গিয়েছিলাম, তাঁর সেদিন খুব মন খারাপ ছিল। কারণ তাঁর বন্ধুটি কয়েক দিন আগে আমেরিকায় মারা গেছেন।

আমাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘শরাফত মারা গেছে। তুমি জানো?’

আমি উত্তর দিলাম, ‘জি। পত্রিকায় পড়েছি।’

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘খুব বর্ণাঢ্য জীবন। প্রথম চান্সেই সিএসপি পাস করেছিল। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ও খুব দুঃখী ছিল। নিঃসঙ্গ ছিল। সময় পেলেই আমার কাছে চলে আসত। ওর খুব বেশি বন্ধু-বান্ধবও ছিল না।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওনার ফ্যামিলি?’

‘হি ওয়াজ ডিভোর্সড। তারপর আর বিয়ে করেনি। ভাবিকে অসম্ভব পছন্দ করত। ভাবিও ওকে ভালোবাসতেন।’

নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা হলে ডিভোর্স হলো কেন?’

‘বিয়ে আসলে শুধু দুটো মানুষের মধ্যে হয় না। দুটো পরিবারের মধ্যেও হয়।’

‘বুঝলাম না।’ আমি কিছুটা অবাক হয়ে বললাম।

তিনি বিষণ্নভাবে বললেন, ‘আমরা সব সময় ভাবি, বিয়ের ক্ষেত্রে দুজন মানুষের মনের মিলই যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তবে শুধু তাদের মনের মিল হলেই হয় না। তাদের পরিবারের মধ্যেও মিল থাকতে হয়।’

‘একটু বুঝিয়ে বলবেন?’ আমি বললাম।

‘দুটো পরিবারের মূল্যবোধ, আচার-আচরণ, শিক্ষাদীক্ষা, আর্থিক অবস্থানে বড় বৈপরীত্য থাকলে অনেক সমস্যা হয়। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীকে সারাজীবন পরস্পরের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়। কিন্তু দুই পরিবার দুই মেরুর হলে এ সম্পর্ক সাধারণত ভালো হয় না, যার প্রভাব পড়ে দাম্পত্য জীবনে।’

বলতে বলতে তিনি থামলেন, তারপর বললেন, ‘মনে করো, কেউ একজন খুব ধনী ফ্যামিলির মেয়ে বিয়ে করল, কিন্তু তার আর্থিক ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো নয়। সে ক্ষেত্রে দুজনের বেড়ে ওঠা, কালচার, জীবনযাপনে অনেক অমিল হতে পারে। সেগুলো মানিয়ে নিতে না পারলে অনেক দ্বন্দ্ব তৈরি হয় এবং তা কাটানো খুব কঠিন। ইট’স অ্যা হার্ড রিয়েলিটি।’

তিনি একটু থেমে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। তাঁর চোখে তীব্র বিষাদ।

‘এসব তফাৎ শুধু যে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দ্বন্দ্ব তৈরি করে তা নয়—দুই বেয়াই পরিবারের মধ্যেও ঝামেলা তৈরি করে। জীবনসঙ্গীর সঙ্গে বৈপরীত্য হয়তো ধীরে ধীরে কমানো যায়, কিন্তু তার পরিবারকে বদলানো অসম্ভব।’

আমি বললাম, ‘ব্যাপারটি নিয়ে আমি এত গভীরভাবে ভাবিনি।’

তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘প্রেমের বিয়ে কিংবা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ, যেটাই হোক না কেন, বিয়ের আগে অবশ্যই দুই পরিবারের বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত। আবেগে ভর করে বা অন্য কোনো কারণে হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।’

তিনি একটু থেমে এক চুমুক পানি খেলেন, তারপর কথায় ফিরে এলেন।

‘আমার ধারণা, শরাফত এবং তার স্ত্রী এই ভুলটিই করেছিল। তারা তাদের দুই পরিবারের বৈপরীত্য নিয়ে ভাবেনি। তাদের পরিবারও ব্যাপারটি নিয়ে মাথা ঘামায়নি। শেষ পর্যন্ত এই ভুলই তাদের বিচ্ছেদ ঘটায়।’

আমার মন খারাপ হয়ে গেল। এমন সময় তিনি অদ্ভুত একটি কথা বললেন, ‘শরাফত শেষ সময়ে ভাবির দেখা পেয়েছিল।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কীভাবে?’

তিনি বললেন, ‘ভাবি ছিলেন ডাক্তার। ডিভোর্সের পর তিনি আমেরিকা চলে যান। পরে সেখানে একটি হাসপাতালে জয়েন করেন। শরাফত আমেরিকায় সে হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছিল। তাই স্ত্রী হিসেবে নয়, ডাক্তার হিসেবে সে তাঁর দেখা পেয়েছিল।’

বলতে বলতে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর বললেন, ‘কিন্তু তাতে ওর কষ্টটা হয়তো আরও বেড়ে গিয়েছিলো।’

‘কেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি আমার দিকে ঝুঁকলেন, তাঁর কণ্ঠ ভেজা, ‘ভাবতে পারো, তোমার সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষটা এত কাছে, কিন্তু তুমি তার হাত ধরতে পারছ না—ব্যাপারটি কত কষ্টের!’

ভদ্রলোকের সঙ্গে কি আপনি একমত?

***

#আসুন মায়া ছড়াই


এ জাতীয় আরো খবর...