আমি বড় হয়েছি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের সিজিএস কলোনিতে। এটি মসজিদ কলোনি নামেও পরিচিত।
এই কলোনির চাচারা প্রায় সবাই ছিলেন খাঁটি মানুষ। অত্যন্ত সহজ-সরল। তবে তাঁদের অতি সরলতার কারণে মাঝে মাঝে খুব মজার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো।
আজ সে রকম একটি ঘটনা বলব।
কলোনিতে বছরে একবার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হতো।
আকবর চাচা ছিলেন আমাদের প্রতিবেশী। রেডিওতে কাজ করতেন বলে তিনি ধরে নিয়েছিলেন এ প্রতিযোগিতায় ধারাবর্ণনা করা তাঁর জন্মগত অধিকার।
তাঁর ধারাবর্ণনা আপনাদের শোনাই।
‘এই মাত্র সম্মানিত প্রধান অতিথি পায়রা উড়াইয়া বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করিলেন। পায়রাগুলি সরল রেখায় উড়িয়া যাইতেছে। যে রেখা সোজাভাবে চলে তাহাকে বলে সরল রেখা। আর যে রেখা বাঁকা হইয়া চলে তাহাকে বলে বক্ররেখা। সুপারি গাছ হইল সরল রেখা। তবে বাতাসের কবলে পড়িয়া মাঝে মাঝে বক্ররেখায় পরিণত হয়।সুপারি হইল এক ধরনের ফল। উহা পানের সহিত খায়। পান হইল এক জাতীয় পাতা…।’
এদিকে ইভেন্টের পর ইভেন্ট শেষ হয়ে যাচ্ছে। সেগুলোর ঘোষণা আসছে না—বিজয়ীদের নামও ঘোষণা করা হচ্ছে না। যারা জিতেছে তারা হায় হায় করছে। এত কষ্ট করে জিতেছে, কিন্তু কেউ জানল না!
এর মধ্যে আকবর চাচার ধারাবর্ণনা পান খাওয়ার কুফলে গিয়ে ঠেকেছে, ‘পান খাওয়া বড়ই বদ অভ্যাস। উহা খাইলে মুখগহ্বরে কর্কট রোগ হইবার সম্ভাবনা থাকে। কর্কট রোগ মানে কর্কট রাশি নহে, উহার অর্থ হইল ক্যান্সার। অতি ভয়ংকর রোগ। মৃত্যু সন্নিকট…।’
বন্ধু মানিক তিনটা ইভেন্টে ফার্স্ট হয়েছে। বেচারার বড় শখ ছিল মাইকে বারবার তার নাম বলা হবে, কলোনির মেয়েরা শুনবে। হিরো হতে না পাওয়ার শোকে সে মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। অন্য বিজয়ীদেরও একই অবস্থা। তারা এতদিন জান দিয়ে প্র্যাকটিস করেছে আজ জিতবে বলে। কিন্তু আকবর চাচার ধারাবর্ণনায় তাদের নামগন্ধও নাই!
সরল রেখা আর বক্ররেখা দিয়ে শুরু করে সুপারি গাছ ডিঙিয়ে, পান খাওয়ার কুফল বর্ণনা শেষে তিনি এখন স্বাস্থ্যরক্ষার গান ধরেছেন, ‘সময় গেলে রে, ও মন, সাধন হবে না, শরীর গেলে রে, ও মন, ঠিক হবে না…।’
লালনগীতির সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে শতাব্দীর বিস্ময় এই গান মনে হয় তিনি নিজেই লিখেছেন!
তবে তাঁর গলা বড়ই নাখাস্তা। মনে হচ্ছে, কান ধরে কেউ থাপড়াচ্ছে।
এমন সময় একজন বলে উঠল, ‘পায়রা তো গিয়া বার্মা ঠেকছে, চাচার তো ঠেকার কোনো লক্ষণ নাই।’
মানিক সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করছে। সঙ্গে অন্য বিজয়ীরাও। কেউ কেউ মনের দুঃখে বেভুলা হয়ে চিৎ হয়ে মাঠে শুয়ে আছে।
অধিক শোকে পাথর নয়-কঠিন প্রস্তর।
সেই বিজয়ের মূল্য কী? যদি নারীরা বিজয়ীর নাম জানিতে না পারে?’
অবশ্য আমার ভালোই লাগছে। কারণ আমি সব খেলায় লাড্ডা হয়েছি। নাম ঘোষণার কোনো সুযোগ নাই।
#আসুন মায়া ছড়াই