বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫২ অপরাহ্ন

নৌপথের নাব্যতা ফেরাতে সরকারের বহুমুখী মেগা পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর আদ্যোপান্ত আবর্তিত হয় এর জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অগণিত নদ-নদী ও নৌপথকে কেন্দ্র করে। ঐতিহাসিকভাবেই এই ভূখণ্ডের ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত এবং কৃষিব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল এই প্রমত্তা নদীগুলো। কিন্তু কালের পরিক্রমায় জলবায়ু পরিবর্তন, উজান থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পলি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদীর দুই তীর ঘেঁষে অবৈধ দখল আর নির্বিচার দূষণের শিকার হয়ে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ আজ এক চরম অস্তিত্ব সংকটে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এই নাব্যতা সংকট এমন এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করে, যার ফলে যাত্রীবাহী নৌযান থেকে শুরু করে ভারী পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এই ক্রমাগত ক্ষীয়মাণ নৌপথকে পুনরায় সচল, নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার লক্ষ্যে সরকার এক বিশাল, বহুমুখী ও যুগান্তকারী কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের নৌপথগুলো সারা বছর সচল রাখতে নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সম্পূর্ণ নতুন করে তিনটি বৃহৎ প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের তিনটি ভিন্ন ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত অঞ্চল—খুলনা, বরিশাল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য আরও তিনটি প্রকল্পের নিবিড় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজও পুরোদমে এগিয়ে চলছে। সরকারের এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য কেবল নদীর তলদেশ যান্ত্রিকভাবে খনন বা ড্রেজিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি নৌপথের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নদীবন্দরগুলোর আধুনিকায়ন, উন্নত ও অত্যাধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা স্থাপন এবং রুটে রুটে নতুন নৌযান চালুর মতো সময়োপযোগী বহুমুখী উদ্যোগও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনে দেশের নৌপথ উন্নয়নের এই সামগ্রিক চিত্র ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এই মেগা উদ্যোগগুলোর বিষয়ে অত্যন্ত আশাবাদী মন্তব্য করে জানিয়েছেন যে, নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও সারা বছর নৌযান চলাচল নিশ্চিত করতে নৌপথের নাব্যতা উন্নয়নে একটি সুনির্দিষ্ট, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তাঁর মতে, শুধু যান্ত্রিক ড্রেজিং দিয়ে নদীর প্রাণ ফেরানো সম্ভব নয়, তাই আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা প্রবর্তন, নদীবন্দর ও ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোর কাঠামোগত উন্নয়ন এবং নৌপথে যাত্রীদের সেবার মান বহুগুণে বাড়ানোর ওপরও বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
আমাদের দেশের নৌপথের নাব্যতার বর্তমান পরিসংখ্যান ও পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্ষা এবং শুষ্ক মৌসুমের মধ্যে নদীপথের গভীরতা ও ব্যবহারযোগ্যতার এক বিশাল ও উদ্বেগজনক ব্যবধান রয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান বর্ষা মৌসুমে যখন পানিতে নদী কানায় কানায় পূর্ণ থাকে, তখন সারা দেশে ব্যবহারযোগ্য নাব্য নৌপথের মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ৯ হাজার ৯০০ কিলোমিটার। কিন্তু বর্ষা শেষে শুষ্ক মৌসুম এলেই নদীর পানি ও স্বাভাবিক স্রোতের প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার কারণে এই দৈর্ঘ্য ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে প্রায় ছয় হাজার ৮০০ কিলোমিটারে নেমে আসে। নৌপথের এই বিশাল তারতম্যের কারণে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে দেশের নৌ-বাণিজ্যে এক অনাকাঙ্ক্ষিত স্থবিরতা নেমে আসে, পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যায় এবং ব্যবসায়ীদের সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে বাধ্য হতে হয়। সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন নৌযান চলাচল নিশ্চিত করতে বর্তমানে বিপুল বাজেটের তিনটি মেগা প্রকল্পের কাজ মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলমান রয়েছে। এই চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এক হাজার ২৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে মোংলা বন্দর থেকে চাঁদপুর হয়ে গোয়ালন্দ ও রূপগঞ্জ পর্যন্ত নৌপথ উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মোংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে মধ্যাঞ্চলের পণ্য পরিবহনকে অত্যন্ত সহজ ও অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী করবে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের মৃতপ্রায় নদীগুলোর প্রাণ ফেরাতে চার হাজার ৩৭১ কোটি টাকার এক বিশাল বাজেটে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই ও পুনর্ভবা নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি চার হাজার ১৬৮ কোটি টাকা বাজেটের আরেকটি মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ঝিনাই, ঘাঘট, বংশী ও নাগদা নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধারের জন্য শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ নিশ্চিতকরণ, নৌপথের সার্বিক উন্নয়ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক বন্যা ব্যবস্থাপনার কাজ চলছে। এই প্রকল্পগুলো সফলভাবে সমাপ্ত হলে শুষ্ক মৌসুমে নৌপথের যে চরম নাব্যতা সংকট তৈরি হয়, তা চিরতরে লাঘব হবে বলে সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও নদী বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করছেন।
চলমান এই বিশাল কর্মযজ্ঞের বাইরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আরও তিনটি নতুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রস্তাব ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত করেছে, যা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই নতুন প্রকল্পগুলোর আওতা, উদ্দেশ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। প্রথম প্রস্তাবিত প্রকল্পটি হলো বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন, হাওরকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের বিকাশ, জলাভূমির সংবেদনশীল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সেচ ও উন্নত ল্যান্ডিং সুবিধা সংবলিত সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। সিলেট অঞ্চলের হাওর ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এবং অকাল বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষায় এই প্রকল্পটি একটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় প্রস্তাবিত প্রকল্পটি দেশের উপকূলীয় ও দুর্গম দ্বীপ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি উদ্যোগ। এটি হলো চট্টগ্রাম-হাতিয়া-চেয়ারম্যানঘাট থেকে ভাসানচরের সঙ্গে নিরাপদ নৌযোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভাসানচর ও হাতিয়ার মতো ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আরও সুদৃঢ়ভাবে যুক্ত করা হবে, যা ওই অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বড় অবদান রাখবে। তৃতীয় প্রস্তাবিত প্রকল্পটি হলো ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের কথা মাথায় রেখে কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলসংলগ্ন আপার মেঘনা নদীর রায়পাড়া থেকে ভাটেরচর পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা উন্নয়ন প্রকল্প। অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পের কাঁচামাল এবং কারখানায় উৎপাদিত পণ্য সহজে, নিরাপদে ও স্বল্প খরচে নৌপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পটি একটি কার্যকর লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে।
নতুন মেগা প্রকল্প চূড়ান্ত করার পাশাপাশি দেশের আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চলে নদী ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যেকোনো বড় নদী প্রকল্পে হাত দেওয়ার আগে নদীর আচরণ ও ভূতাত্ত্বিক গঠন বোঝার জন্য এই সমীক্ষাগুলো অপরিহার্য। এর মধ্যে খুলনা বিভাগে এম-জি খালগুলোর সহায়তায় নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি, শহরের জলাবদ্ধতার দীর্ঘস্থায়ী হ্রাস, জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম রক্ষা এবং কৃষিকাজে সেচ ও আধুনিক ল্যান্ডিং সুবিধা উন্নয়নের মাধ্যমে নদী ব্যবস্থাপনার কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। অন্যদিকে, নদীমাতৃক বরিশাল বিভাগের নদীগুলোর নাব্যতা টেকসইভাবে উন্নয়ন, বর্ষা মৌসুমের জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষিকাজে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক ল্যান্ডিং সুবিধার জন্য ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও বর্তমানে পুরোদমে চলমান রয়েছে। পিছিয়ে নেই পাহাড়বেষ্টিত দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলও। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে কাপ্তাই হ্রদ ও অন্যান্য পাহাড়ি নদীতে নৌচলাচল নিরাপদ করা এবং ল্যান্ডিং সুবিধা উন্নয়নের সম্ভাব্যতা নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে, যা ওই দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের যাতায়াত ও কৃষিপণ্য পরিবহনে নতুন দিগন্তের সূচনা করতে পারে।
নৌযান চলাচলের নিরাপত্তায় সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বর্তমান সরকার আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশ রিজিওনাল ওয়াটারওয়ে ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প-১-এর আওতায় ইতিমধ্যেই অত্যাধুনিক রিমোট মনিটরিং সিস্টেম বা দূরনিয়ন্ত্রিত পর্যবেক্ষণ সিস্টেমসমৃদ্ধ নেভিগেশন সহায়ক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। শীতলক্ষ্যা নদীর ঘোড়াশাল-ময়মনসিংহ নৌপথ, মেঘনা নদীর নবীনগর লিংক চ্যানেল-৫ এবং বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আশুগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ নৌপথসহ দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত কয়েকটি রুটে এই আধুনিক প্রযুক্তি বসানো হয়েছে। এই উন্নত প্রযুক্তির ফলে নদীতে স্থাপিত দিকনির্দেশক বয়া ও বিকনের কার্যক্রম এখন প্রধান কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে দূর থেকেই সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। নদীতে বয়া স্থানচ্যুত হলে বা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে ঘন কুয়াশা বা কালবৈশাখীর মতো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতেও যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী নৌযানগুলো নিরাপদে তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরগুলোর ব্যাপক আধুনিকায়ন এবং দূরপাল্লার নৌপথে নতুন ও আধুনিক লঞ্চ সংযোজনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। যাত্রী সাধারণের স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে ইতিমধ্যে ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-চাঁদপুর, ঢাকা-পটুয়াখালী, ঢাকা-ভোলা, ঢাকা-ইলিশা, ঢাকা-হাতিয়া, ঢাকা-বেতুয়াসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত রুটে নতুন যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচলের চূড়ান্ত অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে এবং যানজট এড়াতে কয়েকটি রুটে রাতের পাশাপাশি দিবাভাগেও নতুন যাত্রীবাহী লঞ্চ সার্ভিস সফলভাবে চালু হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নৌযান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত মাস্টার, ইঞ্জিন চালক, সুকানিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পেশাগত দক্ষতা ও নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নৌপথে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে কালবৈশাখী বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় নৌযান ও যাত্রীদের ক্ষয়ক্ষতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিশ্বব্যাংকের বিশাল আর্থিক সহায়তায় ছয়টি অত্যাধুনিক ভেসেল স্টর্ম শেল্টার বা নৌ-আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি বর্তমানে জোর প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন ও সচল রাখতে কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ধরে রাখার কাজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলমান রয়েছে। কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা না থাকলে চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়বে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় সদরঘাট থেকে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত প্রায় ৬১ লাখ ঘনমিটার পলি ও কাদা মাটি ড্রেজিং করে অপসারণ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ মাটি অপসারণের ফলে ওই এলাকায় নদীর গড় গভীরতা আট মিটারে উন্নীত হয়েছে, যা সমুদ্র থেকে আসা বড় বড় মাদার ভেসেল বা জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। নদীগর্ভে উজান থেকে আসা নতুন পলি জমে নাব্যতা যাতে আবার ব্যাহত না হয়, সে জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং ও মূল ক্যাপিটাল ড্রেজিং সারা বছর অব্যাহত রাখার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শুধু দূরপাল্লার নৌপথ বা সমুদ্রবন্দরই নয়, রাজধানী ঢাকার অসহনীয় যানজট কমাতে এবং নাগরিক জীবনে স্বস্তি ফেরাতে ঢাকার চারপাশের চক্রাকার নৌপথেও নতুন করে প্রাণ সঞ্চারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নদীগুলো দখলমুক্ত করে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এই চক্রাকার নৌপথে আবারও আধুনিক সুবিধাসংবলিত ওয়াটার বাস চালুর জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা নগরবাসীর দৈনন্দিন যাতায়াতে বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে আসবে এবং সড়কপথের ওপর থেকে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের এই বিস্তৃত ও বহুমুখী নৌপথ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, পরিবেশবাদী ও নদী রক্ষায় কাজ করা অ্যাক্টিভিস্টরাও তাদের সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেছেন। নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্যসচিব আমিনুর রসুল এই মেগা প্রকল্পগুলো সম্পর্কে তাঁর ইতিবাচক তবে অত্যন্ত সতর্ক ও বিশ্লেষণধর্মী মতামত তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, সরকারের এই চলমান ও প্রস্তাবিত মেগা প্রকল্পগুলো যদি দুর্নীতিমুক্তভাবে এবং সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের নৌপথের নাব্যতা নিঃসন্দেহে বহুগুণে বাড়বে এবং একই সঙ্গে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতার যে বিশাল তারতম্য দেখা যায়, তা অনেকটাই কমে আসবে। তবে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, নদীর সমস্যা শুধু পলি জমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাই শুধু যান্ত্রিক ড্রেজিং করে কোনো নদী বা নৌপথকে দীর্ঘমেয়াদে সচল রাখা কিছুতেই সম্ভব নয়। নদীর নাব্যতা প্রাকৃতিকভাবে ধরে রাখতে হলে অবশ্যই নদীর স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক পলি ব্যবস্থাপনা, নদীর দুই ধারের ভূমিদস্যুদের অবৈধ দখল কঠোর হাতে উচ্ছেদ, শিল্পের রাসায়নিক বর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্যের নির্বিচার দূষণ রোধ এবং সামগ্রিক পরিবেশগত ও প্রতিবেশগত বিষয়গুলোর ওপর সরকারকে সমানভাবে ও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। খণ্ডিত বা সাময়িক কোনো উদ্যোগ নয়, বরং উজান থেকে ভাটি পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কেবল নদীমাতৃক বাংলাদেশের নৌপথের প্রকৃত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


এ জাতীয় আরো খবর...