শিরোনামঃ
অল্প বয়সেই কোমর ও পিঠের যন্ত্রণা ১০ বছরের সাজা থেকে খালাস চেয়ে আপিল করেছেন ইনু অপারেশন ক্লিন হার্ট করার মতো কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপ-নির্বাচনে সন্ত্রাস ও অপতৎপরতা রোধে সচেতন থাকার আহ্বান ইসি সানাউল্লাহর দেশজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে: রিজভী প্রশ্ন ফাঁসে মন্ত্রণালয়ের কেউ জড়িত থাকলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী গাজীপুরে ওষুধ কারখানার আগুন সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র দাখিলের সময় বাড়ল সৌদিতে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখা হচ্ছে : প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ক্রয় কমিটির ১১ প্রস্তাব অনুমোদন
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন

নিমতলী ও চুড়িহাট্টার ট্র্যাজেডির পরও পুরান ঢাকায় রয়ে গেছে ৪ শতাধিক কেমিক্যাল গুদাম

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

রাজধানীর পুরান ঢাকা যেন আক্ষরিক অর্থেই একটি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছে, যা যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে কেঁপে উঠতে পারে| ২০১০ সালের নিমতলী ট্র্যাজেডি এবং পরবর্তীতে ২০১৯ সালে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ঘটে যাওয়া স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পরও এই এলাকার মূল চিত্র বদলায়নি একটুও| এতগুলো তরতাজা প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়ার পরও পুরান ঢাকার অলিগলি ও ঘিঞ্জি আবাসিক ভবনগুলো থেকে অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিক বা কেমিক্যালের গুদামগুলো আজও পুরোপুরি স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি| আবাসিক ভবনের ভেতরেই অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে এসব দাহ্য পদার্থের মজুত এবং ব্যবসা আগের মতোই বহাল তবিয়তে চলছে| সম্প্রতি চকবাজারের সোয়ারীঘাট এলাকার কামালবাগে অবস্থিত ‘গ্রিন রাবার কারখানা’ নামের একটি কেমিক্যাল গোডাউনে সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে এই ভয়াবহ গাফিলতি ও লুকোচুরি ব্যবসার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে| জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১২ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স এই কারখানাটিকে তাদের মজুতকৃত সব দাহ্য পদার্থ সরিয়ে নেওয়ার জন্য সাত দিনের কঠোর আলটিমেটাম দিয়েছিল| সে সময় এই বিপজ্জনক কারখানাটির অবস্থান ছিল কামালবাগের ৩০/৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের একটি বাড়িতে| সম্প্রতি ওই নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে কারখানাটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি| কিন্তু একটু খোঁজ নিতেই জানা গেল, তারা ব্যবসা গোটায়নি, বরং আগের স্থান থেকে মাত্র আটটি ভবন পার হয়ে নতুন একটি ভবনে তারা তাদের কারখানা ও কেমিক্যালের গুদাম স্থানান্তর করেছে| সেখানে গিয়ে দেখা যায়, আগের মতোই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে দাহ্য পদার্থ নিয়ে তাদের দৈনন্দিন কারবার চলছে, যদিও সেখানে কারখানার মূল মালিকের কোনো দেখা মেলেনি|

কারখানায় কর্মরত মিজানুর রহমান নামের এক শ্রমিক সিটি করপোরেশনের নির্দেশের এক অদ্ভুত ব্যাখ্যা তুলে ধরে জানান যে, টাস্কফোর্স নাকি তাদের কেবল অব্যবহৃত দাহ্য পদার্থগুলো সরিয়ে ফেলতে বলেছিল, কারখানার প্রয়োজনীয় সব কেমিক্যাল সরানোর কোনো নির্দেশ তারা দেয়নি| এই একটি কারখানার চিত্রই বলে দেয় পুরান ঢাকার ভেতরের অবস্থা কতটা ভয়াবহ| খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল এই এলাকাতেই এমন অন্তত ৪০০টির বেশি অবৈধ ও অত্যন্ত বিপজ্জনক কেমিক্যাল গোডাউন এখনো সক্রিয় রয়েছে| আবাসিক এলাকার একদম রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমন শত শত কেমিক্যালের গুদাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় প্রতিনিয়ত এক বুক আতঙ্ক আর ভয় নিয়েই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দারা| চকবাজার, ছোট কাটরা, বড় কাটরা, কামালবাগ এবং আগামসি লেনের বাসিন্দারা এসব মারণফাঁদ নিয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন| সরকার কেমিক্যাল গোডাউন সরানোর প্রথম উদ্যোগ নেওয়ার সাত বছর পার হয়ে গেলেও বাস্তবে সেগুলো তাদের পুরোনো জায়গাতেই রয়ে গেছে| চকবাজার এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মোবারক গভীর আক্ষেপ নিয়ে জানান যে, এসব বিপজ্জনক গোডাউন সরানোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে কিছুটা নড়েচড়ে বসলেও রহস্যজনক কারণে কিছুদিন পরই তারা আবার পিছিয়ে পড়ে| ফলে যেভাবে গোডাউনগুলো ছিল, ঠিক সেভাবেই সেগুলো ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এখানকার সাধারণ মানুষকে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েই প্রতিটি রাত পার করতে হচ্ছে|

ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা শিউরে ওঠার মতো| ২০১০ সালের ৩ জুন রাতে পুরান ঢাকার নবাবকাটরার নিমতলীর ৪৩ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত একটি কেমিক্যালের গোডাউনে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যেখানে আগুনে পুড়ে শতাধিক নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়| এরপর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহিদ ম্যানশনের কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আরও ৭৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে| চুড়িহাট্টার ওই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শীরা আজও আতঙ্কে শিউরে ওঠেন| তারা জানান, আগুন লাগার পর ওয়াহিদ ম্যানশনের ভেতরে থাকা কেমিক্যালের ক্যানগুলো বিকট শব্দে একের পর এক বিস্ফোরিত হতে থাকে এবং সেই বিস্ফোরিত জ্বলন্ত ক্যানগুলো বোমার মতো উড়ে এসে রাস্তায় থাকা মানুষ ও যানবাহনের ওপর পড়তে থাকে| অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুগন্ধি বা পারফিউম তৈরিতে ব্যবহৃত অত্যন্ত দাহ্য যেসব রাসায়নিক সেখানে মজুত ছিল, তার মধ্যে ইথাইল অ্যালকোহল, বিউটেন, আইসো বিউটেন, প্রোপেইন, বুটোক্সি ইথানল, ডাইইথাইল থালেট এবং প্রোপিলিন অন্যতম| এতসব ট্র্যাজেডির পরও অগ্নিকাণ্ড থামেনি| সর্বশেষ গত সোমবার বিকাল ৫টার দিকে চকবাজারের ছোট কাটারায় এসি মসজিদের ঠিক পাশেই অবস্থিত মনসুর খান প্লাজায় আবারও আগুন লাগে| সাত তলা ওই ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকা একটি প্লাস্টিক ব্যাগের দোকান থেকে এই নতুন আগুনের সূত্রপাত ঘটে|

সরকার যে গোডাউন সরাতে উদ্যোগ নেয়নি, তা নয়| নিমতলী ট্র্যাজেডির পরপরই ২০১০ সালে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকাগুলো থেকে এসব কেমিক্যাল গোডাউন স্থায়ীভাবে সরানোর একটি বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল| তখন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে মোট ১ হাজার ৯২৪ জন রাসায়নিক ব্যবসায়ীর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তা মন্ত্রিপরিষদ গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির কাছে হস্তান্তর করেছিল| ওই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসা স্থায়ীভাবে স্থানান্তরের জন্য মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের তুলসীখালীতে একটি আধুনিক ‘কেমিক্যাল পার্ক’ নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিসিককে| পরবর্তীতে চুড়িহাট্টার ঘটনার পর প্রশাসন কঠোরভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে, সাময়িকভাবে হলেও পুরান ঢাকার সব কেমিক্যাল গোডাউন কেরানীগঞ্জের একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করতে হবে|

কিন্তু প্রশাসনের সেই কঠোর সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন মাঠপর্যায়ে চরমভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে| ২০১৯ সালে টাস্কফোর্স গঠনের পর পুরান ঢাকায় দাহ্য পদার্থের মজুত সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং শর্ত দেওয়া হয় যে, যারা এসবের ব্যবসা করেন, তাদের কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর হওয়ার আগ পর্যন্ত ট্রেড লাইসেন্স বাতিল বা বন্ধ রাখা হবে| কিন্তু ধূর্ত ব্যবসায়ীরা আইনের ফাঁকফোকর ঠিকই বের করে নিয়েছেন| তারা এখন কেরানীগঞ্জ উপজেলা থেকে নতুন করে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করে কেমিক্যাল আমদানি করছেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলো কেরানীগঞ্জে না রেখে রাতের আঁধারে পুরান ঢাকাতেই মজুত করে আগের মতোই প্রকাশ্যে বিক্রি করছেন| ডিএসসিসির টাস্কফোর্সের গোপন তথ্যানুযায়ী, আরমানিটোলার আরমানিয়ান স্ট্রিট, বংশালের পুরানা মোগলটুলী, মালিটোলা রোড, চকবাজারের দেবীদাস ঘাট লেন এবং সোয়ারীঘাটের কামালবাগ এলাকায় এখনো অর্ধশতাধিক বড় বড় কেমিক্যাল ও প্লাস্টিকের গোডাউন প্রকাশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে| সরেজমিন এসব গোডাউনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অবাধে কেমিক্যাল দিয়ে রাবার, পলিথিন ব্যাগ এবং প্লাস্টিকের দানা তৈরি হচ্ছে| শ্রমিকরা কেমিক্যালের বস্তা ভ্যানে করে পরিবহন করছেন এবং খালি ড্রামগুলো রাস্তার পাশেই স্তূপ করে রাখছেন|

পুরো পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালাম জানিয়েছেন যে, পুরান ঢাকায় নতুন করে কোনো কেমিক্যাল ব্যবসার লাইসেন্স ইস্যু করা হচ্ছে না| তিনি দাবি করেন, কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ একটি চলমান আইনি প্রক্রিয়া এবং কেউ যদি গোডাউন রেখে অবৈধভাবে ব্যবসা করে, তবে খবর পাওয়া মাত্রই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে| তবে আদালতের নির্দেশনা পালনের ক্ষেত্রেও সরকারের চরম গাফিলতি দেখা গেছে| বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির বা বেলার আইনজীবী এস হাসানুল বান্না জানান, ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট পুরান ঢাকার যেসব আবাসিক ভবনে কেমিক্যাল গোডাউন ও কারখানা আছে, তার একটি হালনাগাদ তালিকা ১৭ এপ্রিলের মধ্যে জমা দেওয়ার জন্য সরকারকে কড়া নির্দেশ দিয়েছিল| কিন্তু দুঃখজনকভাবে সরকার আজও সেই তালিকা আদালতে জমা দেয়নি| নিমতলীর ঘটনার পর একটি মামলায় সরকার ২০১৯ সাল পর্যন্ত মাত্র ৯০০টি কারখানার একটি আংশিক তালিকা জমা দিয়েছিল, যা বর্তমানে মোটেও বাস্তবসম্মত বা আপডেট করা নয়| ফলে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পুরান ঢাকার বুকে মৃত্যুর এই নীরব আয়োজন এখনো নির্বিঘ্নেই চলছে|

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


এ জাতীয় আরো খবর...