আধুনিক বিশ্বের শিক্ষা আঙিনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আজ কোনো দূরবর্তী কল্পনা নয়, বরং শ্রেণিকক্ষের নিত্যদিনের বাস্তব হাতিয়ার। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেখানে এআই ব্যবহারকে একটি অত্যাবশ্যকীয় দক্ষতা হিসেবে গণ্য করে শিক্ষার্থীদের এটি ব্যবহারে সরাসরি উৎসাহ ও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এআই প্রযুক্তির অবাধ প্রসার ঘটলেও তা ব্যবহৃত হচ্ছে চরম গোপনীয়তা আর শাস্তির ভীতির মধ্যে। প্রাতিষ্ঠানিক দিকনির্দেশনার অভাবে শিক্ষার্থীরা চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো শক্তিশালী টুলের সাহায্য নিচ্ছেন গোপনে, আর শিক্ষকরা একে দেখছেন কেবল অসদুপায় বা মেধা ধ্বংসকারী প্রযুক্তি হিসেবে। মুক্ত বিশ্ব যখন এআইকে সঙ্গে নিয়ে জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, তখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজ করছে এক ধরনের লুকোচুরি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে পাঠ্যক্রমের স্বাভাবিক অঙ্গ হয়ে উঠেছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায়। যেমন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ ডেনমার্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে অত্যাধুনিক ‘ওপেন বুক এক্সাম’ বা উন্মুক্ত বই পরীক্ষা পদ্ধতি। তবে এই পরীক্ষায় শুধু প্রচলিত বই নয়, শিক্ষার্থীদের সামনে থাকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার এবং তাতে যুক্ত থাকে পেইড বা প্রিমিয়াম সংস্করণের বিভিন্ন এআই সফটওয়্যার। ডেনমার্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স অধ্যয়নরত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অরুণ বিশ্বাস জানান, সেখানে এআই ব্যবহারে কোনো লুকোচুরি বা অপরাধবোধ নেই। বরং শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের শেখান কীভাবে সঠিক প্রম্পট তৈরি করে জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজতে হয়। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে এবং পরীক্ষার খাতা পর্যালোচনার কাজেও শিক্ষকরা এআইর সহায়তা নিচ্ছেন। একই ধরনের উন্মুক্ত সংস্কৃতির কথা জানান মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সাজিদ আরাফাত। তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সেখানে শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এআইকে শিক্ষার্থীদের সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন চ্যাটজিপিটিতে তথ্য অনুসন্ধান করতে। তবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দেখা হয় শিক্ষার্থী কেবল প্রযুক্তির কপি-পেস্ট করেছে, নাকি নিজের মৌলিক চিন্তাভাবনা ও নতুন পরিভাষার মাধ্যমে স্বকীয় মতামত উপস্থাপন করতে পেরেছে। অর্থাৎ মুখস্থবিদ্যার বদলে বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গিই সেখানে মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি।
অথচ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্লাসরুম ও পরীক্ষার হলের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রবণতা অত্যন্ত ব্যাপক হওয়া সত্ত্বেও তা চলছে গভীর আড়ালে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পাভেল চৌধুরী এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রিফাত ইসলামের মতো হাজারো শিক্ষার্থী জানান, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি, জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝা, গবেষণার প্রাথমিক ধারণা সাজানো কিংবা প্রেজেন্টেশনের খসড়া দাঁড় করাতে তারা নিয়মিত এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই শিক্ষকের সামনে তা প্রকাশ করার সাহস তাদের নেই। শিক্ষকরা জানলে কাজটিকে অনৈতিক ভাববেন কিংবা নম্বর কেটে দেবেন—এমন এক গভীর ভয় শিক্ষার্থীদের তাড়া করে ফেরে। ফলে এআই থেকে পাওয়া উত্তরকে সরাসরি ব্যবহার না করে ভাষা পরিবর্তন, বাক্য পুনর্গঠন এবং কিছু ব্যক্তিগত মতামত যোগ করে তারা জমা দেন, যাতে শিক্ষকের নজর ফাঁকি দেওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার বৈধ এবং কোন পর্যায়ে তা অনৈতিক হিসেবে গণ্য হবে, সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশিকা না থাকায় এই সংকট দিন দিন জটিল হচ্ছে।
এই অস্পষ্টতার মধ্যে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি এআই ব্যবহারের আইনি ও নীতিগত সীমারেখাকে তীব্রভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। স্নাতক পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্ম জেমিনি ব্যবহার করে প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহের চেষ্টা করেন দুই শিক্ষার্থী। বিষয়টি কক্ষ পরিদর্শকের নজরে এলে হাতেনাতে প্রমাণ মেলে যে তারা সরাসরি পরীক্ষার খাতায় এআইর সরবরাহ করা উত্তর হুবহু লিখছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এটিকে গুরুতর অসদুপায় হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিল করার পাশাপাশি পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষার হলে সরাসরি নকল করা নিঃসন্দেহে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ, তবে ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট, সমস্যা সমাধান ও গবেষণার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের বৈধ ক্ষেত্রগুলো অবিলম্বে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব প্রভাব নিয়ে ইতিমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। ২০২৫ সালে ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ার্সের (আইইইই) আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত একটি গবেষণাপত্র দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এআই ব্যবহারের অভাবনীয় চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের ৩১টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৩৭০ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায়, দেশের শতকরা ৯৯ দশমিক ১ ভাগ শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে এআইর সাথে যুক্ত, অর্থাৎ মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী কখনো এআই ব্যবহার করেননি। এর মধ্যে ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এবং ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী সপ্তাহে অন্তত একবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেন। এছাড়া ৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী মাসে অন্তত একবার এটি ব্যবহার করেন। জটিল অ্যাকাডেমিক সমস্যার সমাধান ও অ্যাসাইনমেন্ট তৈরির জন্য ৮৯ শতাংশ এবং দলগত পড়াশোনার কাজে ৭১ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী এআইর ওপর নির্ভরশীল। এমনকি ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্বাস করেন যে এআই তাদের নিজস্ব গতিতে শিখতে কার্যকরভাবে সহায়তা করছে। তবে একই সাথে শতকরা ৮০ দশমিক ১ ভাগ শিক্ষার্থী অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে নিজেদের সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তা ক্ষমতা কমে যাওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিয়েও সিংহভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যে অস্বস্তি ও শঙ্কা পরিলক্ষিত হয়েছে।
একই বছর প্রকাশিত এফ-১০০০ গবেষণায় বাংলাদেশের আটটি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪০ জন শিক্ষার্থী এবং ৪০২ জন শিক্ষকের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়। সেই গবেষণাতেও উঠে আসে যে কেবল শিক্ষার্থীরাই নন, শিক্ষকরাও তাদের পাঠ পরিকল্পনা সাজাতে, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করতে এবং গবেষণার উপাত্ত বিশ্লেষণে নিয়মিত এআই ব্যবহার করছেন। তবে তথ্যের নির্ভুলতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উভয় পক্ষই চিন্তিত। প্রাথমিক শিক্ষা স্তরেও প্রযুক্তির এই হাওয়া পৌঁছে গেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি কর্তৃক ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের ১ হাজার ২৫৩ জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের মধ্যে ৭৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরিতে, ৭৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়নে এবং ৭৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ পাঠসহায়ক উপকরণ তৈরিতে এআই ব্যবহারের তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে চোখ রাখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, বিশ্বের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এআই বিপ্লবকে কীভাবে আলিঙ্গন করে নিয়েছে। যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান হায়ার এডুকেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের (হেপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির স্নাতক পর্যায়ের ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী এআই ব্যবহার করতেন, যার মধ্যে ৮৮ শতাংশই অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে সহায়তা নিতেন। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্যে এই হার বেড়ে যথাক্রমে ৯৫ ও ৯৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে। ডিজিটাল এডুকেশন কাউন্সিলের ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক জরিপে বিশ্বের ১৬টি দেশের ৩ হাজার ৮৩৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৬ শতাংশ জানান যে তারা নিয়মিত পড়াশোনায় এআই ব্যবহার করছেন, যাদের অর্ধেকের বেশি সপ্তাহে অন্তত একবার এবং প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিদিন এই প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছেন। অন্যদিকে ওইসিডির ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৭৫ শতাংশের বেশি শিক্ষক ক্লাসরুম কার্যক্রমে এআই অন্তর্ভুক্ত করেছেন। জার্মানির ২৩ হাজারেরও বেশি উচ্চশিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৯৪ জন শিক্ষার্থী এআই ব্যবহার করেন, যার মধ্যে ৬৫ শতাংশই নিয়মিত ব্যবহারকারী। ফ্রান্সেও মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এআই ব্যবহারকারী উচ্চশিক্ষার্থীর হার ৫৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৮২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবাধ ব্যবহারের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ও শিখনঝুঁকিও সামনে আসছে। ২০২৫ সালে ‘রিসার্চ অ্যান্ড প্র্যাকটিস ইন টেকনোলজি এনহ্যান্সড লার্নিং’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় বলা হয়, এআই ক্লাসরুমের পিছিয়ে পড়া ও কম সক্রিয় শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং তাদের পড়ার আগ্রহ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে গভীর উদ্বেগ। চীনের ২৭ হাজার স্কুল শিক্ষার্থীর ওপর ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত একটি প্রিপ্রিন্ট গবেষণা শিক্ষাবিদদের রীতিমতো চমকে দিয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় হোমওয়ার্ক বা বাড়ির কাজ জমা দিয়ে শিক্ষার্থীরা ১৮ শতাংশ বেশি নম্বর অর্জন করলেও চূড়ান্ত পরীক্ষার হলে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে গড়ে ২০ শতাংশ কম নম্বর পেয়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণ হলো, এআইর মাধ্যমে দ্রুত উত্তর পাওয়ার সুবিধা গ্রহণ করায় শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়ার গভীরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারা বিষয়বস্তু আত্মস্থ করার চেয়ে কাজটি দ্রুত শেষ করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, যা তাদের প্রকৃত মেধা বিকাশে বড় বাধা। এছাড়া ইংল্যান্ডের ৪০৫ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত অপর একটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, স্ক্রিনে এআইর ভাষা পড়ার চেয়ে সনাতন পদ্ধতিতে হাতে নোট নেওয়া পড়া বোঝার ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
মনস্তত্ত্ব ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও বিষয়টি নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ফাহমিদা আক্তার অতীতে ক্যালকুলেটর আবিষ্কারের ঐতিহাসিক উদাহরণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যখন প্রথম ক্যালকুলেটর বাজারে এসেছিল, তখন অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে মানুষের গাণিতিক ক্ষমতা ও মস্তিষ্কের বিকাশ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে সঠিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্যালকুলেটর মানুষের কাজের গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল। এআইর ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। শৈশব বা কৈশোরে শিক্ষার্থীদের এআই থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব নয়, বরং প্রযুক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কীভাবে যৌক্তিকভাবে চিন্তা করতে হয়, তা তাদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে। তবে এর পাশাপাশি স্ক্রিন টাইম বা ডিভাইসে কাটানো সময় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং শিশুরা এআই ব্যবহারের নামে বিপথগামী হচ্ছে কি না, তা অভিভাবক ও শিক্ষকদের তদারকি করা অপরিহার্য।
এই রূপান্তরমূলক প্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগের উপযোগী করে গড়ে তুলতে জাতীয় পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাক্তার মামুন আহমেদ জানান, দেশে একটি সমতাভিত্তিক, আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে এআই সংক্রান্ত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এই নীতিমালার মাধ্যমে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল, নৈতিক ও আইনসম্মত ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। কোন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা এআইকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে, কতটুকু সহায়তা নেওয়া বৈধ হবে এবং কোথায় তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে—নীতিমালায় তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে। মূলত ভীতি ও লুকোচুরির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার অধীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মেধার পরিপূরক হিসেবে গ্রহণ করলেই বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
তথ্যসূদ্র: মানবজমিন