শিরোনামঃ
নিষিদ্ধ দলের ঝটিকা মিছিলে কঠোর অবস্থানে সরকার: রাজনৈতিক গুঞ্জনে উত্তাল ডিসেম্বর ই-রিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন: ১২ বছরের আয়ুষ্কাল ও ২৫ কিমি গতিসীমা নির্ধারণ রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের নাজুক দশা: শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে আছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা: জাপানের সব শর্ত মেনে নিল বাংলাদেশ ৯ হাজার ৫০০ টন চাল বিতরণ স্থগিত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর: ভারত থেকে আমদানিকৃত চালে ক্যানসারের উপাদান ব্যাংক খাতে আস্থার নতুন মাপকাঠি: ৫০ হাজার কোটির বেশি আমানত নিয়ে শীর্ষ অবস্থানে আট বেসরকারি ব্যাংক বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৬ ভারতে মুসলিম-দলিতদের প্রতিনিয়ত নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে: নেহা গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের প্রাক্কালে বিহারের নতুন দাবি ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হলে ট্রানজিট বন্ধের হুঁশিয়ারি নাহিদ ইসলামের
সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের নাজুক দশা: শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে আছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক রূপালী ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের বেহাল দশা দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক অংশই এখন বন্দি হয়ে আছে মাত্র বিশটি প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডাটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স ডিপার্টমেন্টের তৈরি করা সম্প্রতি প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সংগৃহীত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ এই ২০ জন খেলাপির কাছে মোট আটকে থাকা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৮ কোটি টাকারও অধিক। অথচ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের দীর্ঘ সময়ে ব্যাংকটি এসব প্রভাবশালী খেলাপির কাছ থেকে সফলভাবে আদায় করতে পেরেছে মাত্র চার কোটি তিন লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির ঋণ আদায় ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা ও স্থবিরতারই স্পষ্ট প্রমাণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে গত জুন মাস পর্যন্ত রূপালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পাহাড়প্রমাণ পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ১৯ হাজার ৮০৪ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা অনাদায়ী ঋণের প্রায় ৩৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এই ভয়ংকর উল্লম্ফনের পাশাপাশি ব্যাংকটির প্রকৃত মূলধন ঘাটতিও রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বছরের পর বছর ধরে বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায় করতে গিয়ে ব্যাংকটির দীর্ঘসূত্রতা, আইনি মারপ্যাঁচ এবং আদায় কার্যক্রমে নড়বড়ে দুর্বলতা পুরো আর্থিক ভিত্তিকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। যদিও রূপালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণ থেকে মোট ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আদায়ের একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, কিন্তু অর্ধেকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত আদায়ের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক।

শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে রূপালী ব্যাংকের ঋণ আদায়ের সামগ্রিক চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে বিগত বেশ কিছু বছর ধরে এটি চরম ওঠানামার মধ্য দিয়ে চলছে। ইতিপূর্বে ২০২৪ সালে শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে ব্যাংকটি মাত্র ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল, যা পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। কিন্তু চলমান ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের হিসাব নিকাশ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে মাত্র চার কোটি তিন লাখ টাকায় নেমে এসেছে। সামগ্রিকভাবে সব খাতের খেলাপি ঋণ মিলিয়ে ২০২৪ সালে ৩৮১ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা আদায় করা হলেও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মোট আদায়ের পরিমাণ মাত্র ৩৩০ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা ব্যাংকের তারল্য সংকটকে মারাত্মকভাবে ত্বরান্বিত করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকা অনুযায়ী রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের এই দীর্ঘ তালিকায় নাম রয়েছে দেশের বেশ কিছু পরিচিত ও বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর। প্রায় ৯৯৪ কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণ নিয়ে এই তালিকার সর্বাগ্রে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ। ঠিক তার পরেই ৯০৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ক্রোনী গ্রুপের কাছে ৮৭২ কোটি টাকা, খুলনার জুট টেক্সটাইল মিলসের কাছে ৭২৪ কোটি টাকা, চট্টগ্রামের নূরজাহান গ্রুপের কাছে ৬৩০ কোটি টাকা এবং এইচ এস কম্পোজিটের কাছে ৬২০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। তালিকার অন্যান্য বড় খেলাপির মধ্যে মাদারীপুর স্পিনিং মিলস, ব্লু প্লানেট গ্রুপের বদর স্পনিং মিলস, ডলি কনস্ট্রাকশন, সাত্তার গ্রুপ, বেনিটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম গ্লোবাল ট্রেডিং কর্পোরেশন এবং বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অবশ্য এর মধ্যে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জানিয়েছে। রূপালী ব্যাংক জানিয়েছে যে চলতি বছরের এপ্রিলে বসুন্ধরা পেপার মিল লিমিটেড ও ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল লিমিটেড এবং মে মাসে বেনিটেক্স ও জুট টেক্সটাইল মিলস যথাযথ প্রক্রিয়ায় ঋণ পুনঃতফসিল করার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি অবস্থা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছে। তবে তা সত্ত্বেও সামগ্রিক খেলাপি ঋণের বিশাল বহর থেকে ব্যাংকের মুক্তি মেলেনি। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থঋণ আদালতে আইনি লড়াইয়ের জট লেগেই রয়েছে। গত জুন মাস পর্যন্ত কেবল অর্থঋণ আদালতেই রূপালী ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৬টি মামলা ঝুলে আছে, যেখানে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা।

এদিকে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়ে ব্যাংকটি নিয়মিতভাবে ঋণ অবলোপনের পথ বেছে নিয়েছে। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত রূপালী ব্যাংক প্রায় ৪৯০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন বা ব্যালান্স শিট থেকে বাদ দিয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে ৫১৮ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ৪৯৪ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছিল। কিন্তু অবলোপনকৃত এই ঋণগুলো থেকে আদায়ের হার আরও বেশি হতাশাজনক। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অবলোপন করা খাত থেকে ব্যাংকটি তুলতে পেরেছে মাত্র চার কোটি চৌদ্দ লাখ টাকা। উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং নামমাত্র আদায়ের জাঁতাকলে পড়ে রূপালী ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নেমেছে। জুন প্রান্তিক শেষে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৩৩ কোটি টাকায় এবং নিট লোকসানের পরিমাণ হয়েছে ৩৯৭ কোটি টাকা।

চলতি বছরের জুন মাস শেষে রূপালী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটি বিভিন্ন খাতে মোট ৪৭ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যার ফলে ব্যাংকটির ঋণ ও আমানত অনুপাত বা এডিআর বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় নিয়মিত লোকসান ও বিশাল মূলধন ঘাটতির এই সংবাদ সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং শেয়ারের দরপতনের স্থায়ী চাপ তৈরি করছে। ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে আমানতের সিংহভাগ অর্থ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন হিসেবে আটকে থাকায় ব্যাংকটির নতুন করে লাভজনক খাতে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

তবে সার্বিক এই অন্ধকার চিত্রেরও মধ্যে একটিমাত্র ব্যতিক্রমী ও ইতিবাচক দিক হলো কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রূপালী ব্যাংকের ধারাবাহিক সাফল্য। বিগত দুই অর্থবছর ধরে ব্যাংকটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি পরিমাণে কৃষি ঋণ বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০০ কোটি এবং পরবর্তীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫১২ কোটি টাকারও বেশি কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদনে কিছুটা হলেও গতি এনে দিয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এই ক্রমবর্ধমান ভঙ্গুর অবস্থা এবং খেলাপি সংস্কৃতির লাগাম টেনে ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে অত্যন্ত কঠোর ও আগ্রাসী ভূমিকা পালন শুরু করেছে। ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন বা সিপিএ নীতিমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অবলোপন নীতিমালা আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি অর্থঋণ আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য কঠোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে সরাসরি নগদ অর্থ আদায়ের জন্য মাসিক ও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

তথ্যসূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড


এ জাতীয় আরো খবর...