দেশের সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত তিন চাকার ই-রিকশার চলাচল শৃঙ্খলায় আনতে এবং এর সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে আগামী সোমবার অর্থাৎ দুই নভেম্বর থেকে দেশের মোট তেরোটি সিটি করপোরেশনে ই-রিকশার আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। সাধারণ মালিক ও প্রান্তিক চালকদের মধ্যে যাতে কোনো ধরনের আতঙ্ক, বিভ্রান্তি বা অহেতুক উদ্বেগ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে বর্তমানে রাজপথে চলাচলকারী ই-রিকশাগুলো এখনই হুট করে বন্ধ করে দেওয়া হবে না। বৈধ কিংবা অবৈধ নির্বিশেষে বর্তমানের এই বাহনগুলো আপাতত স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করবে এবং পর্যায়ক্রমে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
নতুন এই নির্দেশিকায় ই-রিকশার নিবন্ধন ও নবায়ন ফির সুনির্দিষ্ট আর্থিক কাঠামো অত্যন্ত স্পষ্ট করে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে দুই জন যাত্রী ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ছোট আকারের ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং এর বার্ষিক নবায়ন ফি চার হাজার টাকা ধার্য করা হয়েছে। অন্যদিকে চার জন যাত্রী ধারণক্ষমতা সম্পন্ন অপেক্ষাকৃত বড় আকারের ই-রিকশার জন্য এককালীন নিবন্ধন ফি দশ হাজার টাকা এবং বাৎসরিক নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈধ নিবন্ধন ছাড়া কোনো ই-রিকশা পরবর্তীতে দেশের কোনো সড়কে চলতে পারবে না। একজন নাগরিক তাঁর নিজের একটিমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডির বিপরীতে যেকোনো এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন এলাকা মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার মালিকানা ও নিবন্ধন নেওয়ার আইনি সুযোগ পাবেন।
যাত্রী নিরাপত্তা এবং যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নতুন বিধিমালায় অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হয়েছে। প্রতিটি ই-রিকশায় বাধ্যতামূলকভাবে আধুনিক স্পিডোমিটার স্থাপন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে গাড়ির গতি সবসময় চালক ও ট্রাফিক পুলিশের নজরে থাকে। সমস্ত ই-রিকশার সর্বোচ্চ অনুমোদিত গতিসীমা প্রতি ঘণ্টায় পঁচিশ কিলোমিটারের বেশি হতে পারবে না। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং তীব্র জনবহুল এলাকায় গাড়ি চলাচলের সর্বোচ্চ গতিসীমা আরও কমিয়ে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র পনেরো কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে। নির্ধারিত এই গতিসীমা অমান্য করলে কিংবা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে সংশ্লিষ্ট চালক ও মালিককে কঠোর আইনি ব্যবস্থার সম্মুখীন হতে হবে।
ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল বা লাইফটাইম সম্পর্কে সরকার জানিয়েছে যে প্রতিটি ই-রিকশার কার্যকর অর্থনৈতিক মেয়াদ হবে নিবন্ধনের প্রকৃত তারিখ থেকে শুরু করে টানা বারো বছর পর্যন্ত। নির্ধারিত এই বারো বছর পূর্ণ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার লাইসেন্স, নিবন্ধন নম্বর এবং নম্বর প্লেট চিরতরে বাতিল বলে গণ্য করা হবে। এছাড়া শহরজুড়ে ট্রাফিক জ্যাম কমানো এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য জোনভিত্তিক চলাচল, নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ এবং ই-রিকশার জন্য সুনির্দিষ্ট গাড়ির রং চূড়ান্ত করার বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এক জোনের নিবন্ধিত রিকশা অন্য জোনে গিয়ে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতে পারবে না। প্রতিটি ওয়ার্ড বা উপযুক্ত জনসমাগমপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা রাখার কঠোর নির্দেশও প্রদান করা হয়েছে যাতে যত্রতত্র গাড়ি রেখে যানজটের সৃষ্টি না করা হয়।
পরিবেশ সুরক্ষা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনতে চার্জিং ব্যবস্থার ওপর অত্যন্ত কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে। অবৈধ উপায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং কেউ এই ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জিংয়ের কাজ বাধ্যতামূলকভাবে সরকারের অনুমোদিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট চার্জিং স্টেশন বা নির্ধারিত গ্যারেজ থেকেই সম্পন্ন করতে হবে। এসব চার্জিং স্টেশনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌর প্যানেলের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যাতে জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে এবং পরিবেশ দূষণ রোধ করা সম্ভব হয়। এছাড়া ব্যবহৃত ব্যাটারি যত্রতত্র না ফেলে নিয়মমাফিক পুনর্ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত ডিলারের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই যুগান্তকারী উদ্যোগকে সার্বিকভাবে স্বাগত জানালেও এর মাঠপর্যায়ের সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে দীর্ঘকাল ধরে সম্পূর্ণ অসংগঠিত অবস্থায় থাকা এই পরিবহন খাতকে নিয়মের মধ্যে আনতে হলে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় এবং কঠোর মনিটরিং থাকা আবশ্যক। একই এনআইডিতে একাধিক ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ থাকার ফলে যাতে কোনো সিন্ডিকেট বা বাণিজ্যিক স্বার্থান্বেষী মহল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
চালকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। স্বীকৃত কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালকদের ট্রাফিক সিগন্যাল, সড়ক নিরাপত্তা এবং গাড়ির ব্যাটারি রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুমোদিত মানের ই-রিকশা উৎপাদনে এবং চালকদের সহজ শর্তে ঋণ সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এই খাতের রূপান্তর ঘটানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
যানজট নিরসন এবং স্বল্পগতির এই যানবাহনকে একটি শৃঙ্খলিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সরকারের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। নগরবাসীর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ জনগণ ও মালিকপক্ষকেও সমানভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
পরিবহন ব্যবস্থার সামগ্রিক মানোন্নয়ন এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসের ক্ষেত্রে এই নীতিমালা একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। চালক ও মালিকদেরও সচেতন হতে হবে যাতে তারা কোনোভাবেই অতিরিক্ত গতি বা অনিয়মের নিয়মবহির্ভূত আচরণের আশ্রয় না নেন।
সামগ্রিকভাবে, ব্যাটারিচালিত রিকশার এই নতুন নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনা আধুনিক নগর পরিকল্পনার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে। নগরবাসীর স্বস্তিদায়ক যাতায়াত এবং শৃঙ্খলিত ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
ভবিষ্যতে এই খাতের সুফল নিশ্চিত করতে হলে নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং নিয়মিত তদারকি বজায় রাখতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারে।
সব মিলিয়ে আগামী সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই নিবন্ধন কার্যক্রম দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। যথাযথ মনিটরিং এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই স্বল্পগতির জনপ্রিয় বাহনটি নগরবাসীর দৈনন্দিন যাতায়াতে এক নিরাপদ ও শৃঙ্খলিত মাধ্যম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে বলে আশা করা যায়।
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর ও সময় নিউজ