শিরোনামঃ
নিষিদ্ধ দলের ঝটিকা মিছিলে কঠোর অবস্থানে সরকার: রাজনৈতিক গুঞ্জনে উত্তাল ডিসেম্বর ই-রিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন: ১২ বছরের আয়ুষ্কাল ও ২৫ কিমি গতিসীমা নির্ধারণ রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের নাজুক দশা: শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে আছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা: জাপানের সব শর্ত মেনে নিল বাংলাদেশ ৯ হাজার ৫০০ টন চাল বিতরণ স্থগিত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর: ভারত থেকে আমদানিকৃত চালে ক্যানসারের উপাদান ব্যাংক খাতে আস্থার নতুন মাপকাঠি: ৫০ হাজার কোটির বেশি আমানত নিয়ে শীর্ষ অবস্থানে আট বেসরকারি ব্যাংক বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৬ ভারতে মুসলিম-দলিতদের প্রতিনিয়ত নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে: নেহা গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের প্রাক্কালে বিহারের নতুন দাবি ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হলে ট্রানজিট বন্ধের হুঁশিয়ারি নাহিদ ইসলামের
সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন

নিষিদ্ধ দলের ঝটিকা মিছিলে কঠোর অবস্থানে সরকার: রাজনৈতিক গুঞ্জনে উত্তাল ডিসেম্বর

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে আগামী ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে একধরনের তীব্র গুঞ্জন ও উত্তাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমান সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে এই মাসটিকে ঘিরে এক অদ্ভুত অতি উৎসাহী মনোভাব ও তৎপরতা দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি বড় অংশ আত্মগোপনে বা বিদেশে অবস্থান করার পরেও ডিসেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার সম্ভাবনাকে পুঁজি করে দলটি নানাভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা, হোটেল বা গোপন স্থানে ছোট পরিসরে বৈঠক এবং পেশাজীবী সংগঠনের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে প্রকাশ্যে উপস্থিত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো রাজনৈতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

এই সমস্ত তৎপরতার নেপথ্যে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে শেখ হাসিনার পূর্ববর্তী কিছু ঘোষণা। গত জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আসতে পারেন এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে নিজ ইচ্ছায় কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। যদিও সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা বাস্তবসম্মত রূপরেখা সেই ঘোষণায় ছিল না, তবুও এই একটিমাত্র মন্তব্যকে পুঁজি করে মাঠের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে দেশের মাটিতে ফেরার এই ঘোষণা কেবল মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি বা নেতাকর্মীদের হতাশা কাটানোর একটি কৌশল মাত্র, যার সঙ্গে বাস্তব মাটির রাজনীতির কোনো মিল নেই।

ডিসেম্বর মাসটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা ও ছিন্নভিন্ন হয়ে থাকা দলটির জন্য এই মাসটিকে ঘিরে নিজেদের সাংগঠনিক অস্তিত্বের জানান দেওয়ার একটি মানসিক তাগিদ কাজ করছে। আত্মগোপনে থাকা সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে একধরনের কৃত্রিম আশাবাদ তৈরি করাই এই অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য। তবে দলটির কার্যক্রম আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকায় এবং বিগত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অসংখ্য মামলা চলমান থাকায় তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা আইনত সম্পূর্ণ অসম্ভব।

মাঠপর্যায়ের বিচ্ছিন্ন কিছু কর্মতপরতা আর কেন্দ্রীয়ভাবে একটি কার্যকর রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘুরে দাঁড়ানো কখনোই এক বিষয় নয় বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক গবেষকরা। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থানরত শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের প্রকৃত সংযোগ কতটা সচল রয়েছে, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে। তাছাড়া ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতনের পর সাধারণ মানুষের মনে দলটির প্রতি যে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ জমা হয়েছে, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। হাজার হাজার মানুষের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে ফ্যাসিবাদী এই শক্তির পুনরুত্থানের যেকোনো চেষ্টা জনগণ প্রতিহত করতে প্রস্তুত রয়েছে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ অভিমত ব্যক্ত করেছে।

সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এই সম্ভাব্য অপতৎপরতা সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক ও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব চাইলেও ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরতে পারবে না এবং যদি কেউ অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করে, তবে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে আইন অনুযায়ী হেফাজতে নেওয়া হবে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন যে ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের ন্যূনতম চেষ্টা চালায়, তবে পুলিশ অত্যন্ত কঠোর ও নজিরবিহীন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত এই দলটির সামনে পাহাড়সম তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথমত, কার্যকর ও সুসংগঠিতভাবে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করা, যা বর্তমানের এই বৈরী পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা, কারণ জুলাই-আগস্টের গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত দলটির পক্ষে জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়া অলীক কল্পনা। তৃতীয়ত, দেশের প্রচলিত আইন এবং সংবিধানের কঠোর সীমানা অতিক্রম করে কার্যক্রম পরিচালনা করার আইনি বাধা। এই বহুমুখী সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে কেবল কিছু অতি উৎসাহী নেতার উসকানিমূলক কথায় মাঠে নেমে নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন তৃণমূলের কর্মীরা।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চিন্তাবিদ আবদুল লতিফ মাসুম এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করেছেন যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এই দলটির রাজনীতির করুণ অধ্যায় চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় বা দুই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও হঠাৎ ডিসেম্বরে ফেরার ফাঁপা হুংকার দিয়ে নেত্রী কেবল নিজের অনুসারীদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি বলেন যে দলের শীর্ষ নেতারা বিদেশে বসে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন আর তাদের মিষ্টি কথায় ভুলে দেশের সাধারণ কর্মীরা মাঠে নেমে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটছেন। দেশের জনগণ তাদের অপরাধ ও দুর্নীতির কথা ভুলে যায়নি এবং রাজনীতিতে তাদের পুনরুত্থানের আর কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে একটি রাজনৈতিক দলের বেঁচে থাকা বা পুনরুজ্জীবিত হওয়া কেবল নেতার মুখের বুলির ওপর নির্ভর করে না, এর জন্য প্রয়োজন জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক পরিবেশ। কিন্তু বিগত দেড় দশকে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করার কারণে এই দলটি আজ জনগণের কাছে সম্পূর্ণ ধিক্কৃত।

ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি রোধে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষও দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের পাশে রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের ফলে নিষিদ্ধ সংগঠনের যেকোনো অবৈধ কার্যক্রম অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো চক্রান্ত জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দেবে।

সব মিলিয়ে আগামী ডিসেম্বর মাসকে ঘিরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে অতি উৎসাহ ও প্রত্যাবর্তনের গুঞ্জন ছড়ানো হচ্ছে, তার নেপথ্যে বড় কোনো রাজনৈতিক অর্জনের চেয়ে নিছক কর্মী টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নেই। আইনের শাসন, বিচার প্রক্রিয়া এবং জনগণের তীব্র গণপ্রত্যাখ্যানের মুখে দাঁড়িয়ে এই ধরনের অপতৎপরতা কেবল তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেই আরও প্রকট করে তুলছে। দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় এবং জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা সমুন্নত রাখতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নাশকতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে সর্বোচ্চ কঠোরতা বজায় রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


এ জাতীয় আরো খবর...