বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘প্রটোকল’ আর ‘প্রভাব’। রাজপথে সাইরেন বাজিয়ে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিম্মি করে ভিভিআইপিদের যাতায়াত এ দেশের মানুষের কাছে ছিল এক যন্ত্রণাদায়ক নিয়মিত চিত্র। কিন্তু বুধবার নতুন সরকারের প্রথম কর্মদিবসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক নজিরবিহীন নির্দেশনা এবং রাজপথে তার বাস্তব প্রতিফলন দেশের কোটি মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আইজিপিকে দেওয়া তাঁর স্পষ্ট বার্তা—‘আমার চলাচলের কারণে যেন জনদুর্ভোগ না হয়’—এবং ট্রাফিক সিগন্যালে খোদ প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর থেমে থাকার দৃশ্যটি কেবল একটি প্রতীকী ঘটনা নয়, বরং এটি ক্ষমতার দাম্ভিকতা থেকে মুক্তির এক নতুন রাজনীতির পদধ্বনি।
বিগত কয়েক দশক ধরে আমরা দেখেছি, শাসকগোষ্ঠী নিজেদের জনগণের সেবক দাবি করলেও আচরণে প্রকাশ পেত অধিপতিসুলভ মানসিকতা। সড়ক বন্ধ করে মুমূর্ষু রোগীর অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা কিংবা পরীক্ষার্থীর কেন্দ্রে পৌঁছানো অসম্ভব করে তোলা ছিল এক ধরণের প্রশাসনিক নিপীড়ন। আজ সেই প্রথা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে উদাহরণ তৈরি করলেন, তা রাষ্ট্র সংস্কারের ‘৩১ দফা’র অন্তনিহিত চেতনারই বাস্তব রূপ। তিনি প্রমাণ করেছেন, আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন আইনের রক্ষক এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পরিচালক নিজেও সেই আইন মেনে চলেন।
কেবল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাই নয়, আজ সচিবালয়ে প্রথম কর্মদিবসে অন্যান্য মন্ত্রীদের কণ্ঠেও একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী যখন বলেন ‘মব জাস্টিস বন্ধ করা হবে’, অর্থমন্ত্রী যখন ‘পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি’র অবসান চান, কিংবা সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী যখন নিজেকে ‘শাসক নয়, সেবক’ হিসেবে পরিচয় দেন—তখন সাধারণ মানুষ এক ধরণের মানসিক স্বস্তি খুঁজে পায়। জুলাই বিপ্লবের যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আমরা দেখেছি, তার মূলে ছিল বৈষম্যহীন এক বাংলাদেশ গড়ার আকাক্ষা। রাস্তার ট্রাফিক সিগন্যালে সাধারণ নাগরিকের পাশে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির অবস্থান সেই বৈষম্যহীনতারই এক শক্তিশালী বার্তা।
তবে মনে রাখতে হবে, যেকোনো মহৎ উদ্যোগের শুরুটা যতটা সহজ, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ততটাই কঠিন। অতীতেও আমরা বিভিন্ন সময় এমন জনবান্ধব উদ্যোগের ভ্রূণাবস্থা দেখেছি, যা সময়ের পরিক্রমায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা তোষামোদকারীদের বলয়ে হারিয়ে গেছে। নতুন সরকারের এই ‘সেবক’ সাজার মানসিকতা যেন কেবল প্রথম কর্মদিবসের চমক হয়ে না থাকে। পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে দেওয়া এই নির্দেশ যেন মাঠপর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী অভ্যাসে পরিণত হয়।
পরিশেষে আমরা বলতে চাই, মানুষের ‘পাহাড় সমান প্রত্যাশা’ পূরণের পথে এটি একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। জনগণের ওপর আধিপত্য বিস্তার নয়, বরং জনগণের কাতারে এসে দাঁড়ানোর এই মানসিকতাই পারে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভা আজ যে নজির স্থাপন করলেন, তা যেন আগামী পাঁচ বছরের প্রতিটি দিনে প্রতিটি পদক্ষেপে দৃশ্যমান থাকে—এটাই ‘দৈনিক দিনবদল’-এর প্রত্যাশা।