চেকের মামলা চলাকালীন আসামি বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারির আইনি ভিত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, যদি আদালত মনে করেন কোনো আসামি বিচার এড়াতে বা মামলা বাধাগ্রস্ত করতে দেশত্যাগ করতে পারেন, তবে আদালত তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন। ২০২১ সালে হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে জানান যে, ঋণখেলাপি বা চেকের মামলার আসামিরা যাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে অকার্যকর করতে না পারে, সেজন্য আদালত প্রয়োজনে তাদের পাসপোর্ট জব্দ বা বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন। কাজেই চেকের মামলা একটি বিশেষ আইন হলেও বিচার সুনিশ্চিত করতে, বাদীর পাওনা আদায়ের পথ সুগম করতে বিচারিক আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারা মতে সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করে আসামীর বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন।
এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ও ৪৯৯ ধারামতে আসামি যখন জামিন পান, তখন তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়া এলাকা বা দেশ ত্যাগ করবেন নাএমন একটি সুপ্ত শর্ত থাকে। ফলে আসামির জামিনের শর্ত হিসেবে তার পাসপোর্ট জমা রাখা অথবা তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া বিষয়ে বাদী পক্ষ আবেদন করতে পারেন। যাতে আসামী জামিনের অপব্যবহার করে পালিয়ে যেতে না পারেন।
এ বিষয়ে আপিল বিভাগের একটি দারুন সিদ্ধান্ত রয়েছে। “দুদক বনাম আতাউর রহমান এবং অন্যান্য”, যা ৭৩ ডিএলআর ৩৬৬ পৃষ্ঠায় আদালতের পর্যবেক্ষণে বলেন যে, যদি কোনো ব্যক্তি বা আসামির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলমান থাকে এবং আদালতের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে আসামি “বিচারের হাত থেকে বাঁচতে বা বিচার প্রক্রিয়া এড়াতে” বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন, তবে সংশ্লিষ্ট আদালত সেই আসামির বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবেন।
এছাড়া আসামি যদি জামিন নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তবে আদালত তার জামিন বাতিল করতে পারেন অথবা তাকে দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার জন্য তার পাসপোর্ট জমা রাখার নির্দেশ দিতে পারেন। ৪৩ ডিএলআর (এইচসিডি) ৪৪৬।
সংবিধান নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা দিলেও, যদি কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা ফৌজদারি মামলা চলমান থাকে, তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে আইনানুগভাবে সেই স্বাধীনতায় যৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করা সম্ভব। অর্থাৎ, মামলার স্বার্থে আদালত বিদেশ গমনে বাধা দিতে পারেন। সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ (চলাফেরার স্বাধীনতা) বনাম ন্যায়বিচার (৭০ ডিএলআর (এইচসিডি) ৪৮)
আদালত তার প্রক্রিয়া অপব্যবহার রোধ করতে যেকোনো প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারেন। যদি আসামি বিদেশে চলে গেলে ট্রায়াল অকার্যকর হয়ে যায়, তবে ৫৬১এ ধারার আওতায় আদালত তাকে দেশত্যাগে বাঁধা দিতে পারেন। ৫১ ডিএলআর (এডি) ২৪২।
যিনি চেকের মামলাটি দায়ের করেছেন, তিনিই প্রধান ব্যক্তি যিনি আসামীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে বিচারিক আদালতে তার মনোনীত আইনজীবীর মাধ্যমে এই আবেদন করতে পারেন। মামলার শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) বাদীর আবেদনের সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে পারেন।
যদি মূল বাদী কোনো কারণে আদালতে উপস্থিত থাকতে না পারেন বা দেশের বাইরে থাকেন, তবে তার মনোনীত আইনি প্রতিনিধি বা আমমোক্তার বাদীর পক্ষে এই আবেদন দাখিল করতে পারেন।
তবে ফৌজদারি মামলায় বাদী তার নিযুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে যেকোনো আবেদন দাখিল করতে পারেন। এই ধরনের আবেদন বাদীর স্বাক্ষরযুক্ত হলে এবং আইনজীবী তা পেশ করলে আদালত তা গ্রহণ করে থাকেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় মামলার যেকোনো পর্যায়ে বাদী বা বিবাদী তাদের নিযুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন পেশ করতে পারেন। যদি আদালত বিশেষ কোনো কারণে (যেমন সাক্ষ্য গ্রহণ) সমন জারি না করেন, তবে বাদীর শারীরিক উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। (৫৫ ডিএলআর ৩৪৪)
আসামির আইনজীবী যদি প্রমাণ করতে পারেন যে আসামি পালিয়ে যাচ্ছেন, তবে বাদীর অনুপস্থিতিতেও আদেশ দেওয়া সম্ভব। (৭৩ ডিএলআর (এডি) ৩৬৬)
তবে আবেদনের সাথে আসামীর বিদেশ যাওয়ার টিকিট কাটা, ভিসা করা বা সম্পত্তি বিক্রি করার তথ্য, চ্যাট, ইমেইল কিংবা আরও সম্ভাবনাময় কোন তথ্য থাকলে সেগুলো দিতে হবে। সেইসাথে আবেদনে নির্দিষ্টভাবে বলতে হবে যে, আসামির পাসপোর্ট জব্দ করা হোক এবং ইমিগ্রেশন পুলিশকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আদেশ পাঠানো হোক।
এছাড়া বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩ এর ধারা ৭(১)(ব) অনুযায়ী যদি কোনো আদালত কারো বিদেশ গমন নিষিদ্ধ করেন, তাহলে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ পাসপোর্ট জব্দ বা বাতিল করতে পারে।
বাদীপক্ষের আবেদনের মূল যুক্তিগুলো হতে পারে:
১। আসামি ইতিপূর্বে জামিন নিয়েছেন এবং বর্তমানে জামিনের অপব্যবহার করে স্থায়ীভাবে দেশত্যাগের পরিকল্পনা করছেন।
২। আসামি বিদেশে চলে গেলে মামলার বিচার প্রক্রিয়া ও রায় বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
৩। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে আসামির পাসপোর্ট জব্দ এবং বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা একান্ত প্রয়োজন।
৪। আইন, পারিপার্শ্বিকতা, উচ্চ আদালতের নজিরের ভিত্তিতে আসামির বিদেশ গমনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা পাসপোর্ট জমা রাখার আদেশ দিতে পারেন।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮, ই-মেইল:seraj.pramanik@gmail.com