আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সাথে ইরানের সরাসরি সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজার এখন আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছে। ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েলের দাম মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। হরমোজ প্রণালী বন্ধের আশঙ্কায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধসের পূর্বাভাস দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০-৭৩ ডলারের আশেপাশে থাকলেও, খামেনির মৃত্যু এবং মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার খবরের পর তা ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১২৫ ডলারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ব্লুমবার্গ ও রয়টার্সের বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এটি ১৫০ ডলার স্পর্শ করতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা ডেকে আনবে।
বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ (প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল) পারস্য উপসাগরের সরু জলপথ ‘হরমোজ প্রণালী’ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যদি প্রতিশোধ হিসেবে এই পথটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় বা সেখানে মাইন পেতে রাখে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ এক ধাক্কায় এক-পঞ্চমাংশ কমে যাবে। এর ফলে:
সরবরাহ সংকটে এশিয়া ও ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
লজিস্টিক ও শিপিং খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
ইরান ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা কেবল মার্কিন ঘাঁটি নয়, বরং যারা এই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে সহায়তা করবে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করবে। দুবাই ও দোহার কাছে বিস্ফোরণের ঘটনা সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন। সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলক্ষেত্রগুলো এখন ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মধ্যে থাকায় বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
আজ (১ মার্চ) ভিয়েনায় ওপেক প্লাস দেশগুলোর একটি জরুরি বৈঠকের কথা রয়েছে। সৌদি আরব ও রাশিয়া চাইলে অতিরিক্ত উৎপাদন বাড়িয়ে তেলের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। তবে বর্তমান সামরিক উত্তেজনার মুখে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত কেবল উৎপাদন বাড়ানো খুব একটা সুফল দেবে না।
নেট তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগের:
জ্বালানি ভর্তুকি: আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ অসহনীয় হয়ে উঠবে।
মূল্যস্ফীতি: ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে।
ডলার সংকট: তেলের উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হবে।
এদিকে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মার্চ মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আজ রবিবার (১ মার্চ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এই স্বস্তির খবর নিশ্চিত করেছে। মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা’ অনুযায়ী মার্চ মাসে ডিজেল ১০০ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা লিটার দরে বিক্রি হবে। এছাড়া পেট্রোল ১১৬ টাকা ও কেরোসিনের দাম ১১২ টাকায় অপরিবর্তিত থাকবে।
আন্তর্জাতিক এই অস্থিরতার মধ্যেও দেশের বাজারে দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সাধারণ মানুষের জন্য বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশীয় বাজারে তেলের মূল্য তালিকা (মার্চ ২০২৬)