মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক গভীর সংকটের সৃষ্টি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারে। সোমবারের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ বাজার চিত্র অনুযায়ী:
ব্রেন্ট ক্রুড: ব্যারেলপ্রতি ১১১.০৪ ডলার।
ডব্লিউটিআই (WTI): ব্যারেলপ্রতি ১০৬.১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুড ২৭ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই ৩৫.৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী রেকর্ড।
জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক দাম নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ নিস্পৃহ মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এক পোস্টে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়া খুব বড় বিষয় নয়; এটি নিরাপত্তার জন্য একটি ছোট মূল্য।”
ট্রাম্প দৃঢ়তার সাথে আরও বলেন, “ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হয়ে গেলে এই স্বল্পমেয়াদী উচ্চমূল্য দ্রুতই কমে যাবে।” তিনি আরও যোগ করেন, যারা এই মূল্যবৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী মনে করে, তারা কেবল ‘মূর্খ’। এর আগে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটও একই সুরে কথা বলেছিলেন, যেখানে তিনি পেট্রোলের দামের এই বৃদ্ধিকে ‘সাময়িক’ বলে অভিহিত করেন।
জ্বালানি বিশ্লেষক ড্যানিয়েল হাইন্সসহ বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণ কেবল উৎপাদন কম নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়া।
হরমুজ প্রণালী: বিশ্বের তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ এই রুটে চলাচল করে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (IRGC) এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ও হুমকির কারণে কার্যত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
অবকাঠামোয় হামলা: ইরান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন তেল স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে উৎপাদন ও সংরক্ষণাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি: বিশ্লেষকদের মতে, যদি পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হয় এবং তেলের কূপগুলো বন্ধ করতে হয়, তবে সংঘাত থামলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে, যা তেলের দামকে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চস্তরে ধরে রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির হারের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।