১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চের দিনগুলো ছিল প্রতিটি মুহূর্তেই বারুদঠাসা। ১১ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের দশম দিন (২ মার্চ থেকে ধরলে)। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় পুরো পূর্ব পাকিস্তান কার্যত একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ১১ মার্চের প্রধান ঘটনাবলি নিচে তুলে ধরা হলো:
১১ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করেন। এদিন তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত বাঙালি রাজপথ ছাড়বে না। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাসভবন তখন কার্যত শাসনকেন্দ্র বা ‘সচিবালয়’-এ পরিণত হয়েছিল। সকল স্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতো।
এদিনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মকর্তাদের দৃঢ় অবস্থান। এদিন সামরিক সরকার কর্তৃক কোনো কর্মকর্তা কাজে যোগ দেননি। এমনকি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে নিম্ন আদালতের বিচারক পর্যন্ত সবাই বঙ্গবন্ধুর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে আদালত বর্জন করেন। এর ফলে পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো পুরোপুরি অচল হয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন। ব্যাংক লেনদেন সীমিত সময়ের জন্য খোলা রাখা এবং কৃষকদের কর স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এটি ছিল সমান্তরাল সরকার পরিচালনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী বুঝতে পারছিল যে তারা বড় কোনো সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই বিশ্ববিবেকের কাছে সত্য গোপন করার জন্য তারা বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে। ১১ মার্চ অনেক বিদেশি সাংবাদিককে জোর করে ঢাকা ত্যাগে বাধ্য করা হয়। তবে কয়েকজন সাংবাদিক কৌশলে থেকে যান যারা পরবর্তীতে ২৫ মার্চের গণহত্যার খবর বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন।
এদিন ঢাকার আকাশ ছিল স্লোগানে উত্তাল। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’—এই স্লোগানে ছাত্র, জনতা ও শ্রমিকরা মিছিল বের করেন। বিভিন্ন স্থানে লাঠি মিছিল ও ডামি রাইফেল নিয়ে কুচকাওয়াজ চলতে থাকে। নারীরাও ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের শপথ নেন।
১০ ও ১১ মার্চ থেকেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে বড় বড় শিরোনাম করতে থাকে। জাতিসংঘ তাদের কর্মকর্তাদের ঢাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে, যা প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে।
১১ মার্চ ছিল বাঙালির আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়তার দিন। এদিন প্রমাণ হয়েছিল যে, বন্দুকের নল দিয়ে নয়, বরং নৈতিক শক্তিতে একটি পুরো জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আইন তখন অচল, আর বাঙালির হৃদয়ে তখন কেবল একটিই আইন—সেটি হলো ‘স্বাধীনতা’।