রাজধানীসহ সারা দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র হাহাকার বিরাজ করলেও বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই। বরং সাধারণ গ্রাহকদের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতা বা ‘প্যানিক বায়িং’-এর কারণেই বাজারে এই কৃত্রিম সংকট ও চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বারবার পর্যাপ্ত মজুতের কথা জানালেও খুচরা পর্যায়ে অর্থাৎ পাম্পগুলোতে এর কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।
মালিকপক্ষের দাবি ও সতর্কবার্তা
আজ রোববার (২৯ মার্চ) বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক এই সংকটের পেছনে গ্রাহকদের অস্বাভাবিক চাহিদাকেই দায়ী করেছেন। তিনি জানান, সরকারের তরফ থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই। কিন্তু সাধারণ সময়ের তুলনায় হঠাৎ করে চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় পাম্পগুলোর মজুত খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এই ভোগান্তি খুব সহজে বা রাতারাতি দূর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, সরকারকে এখন শুধু সরবরাহ ঠিক রাখলেই চলবে না; বরং মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি এবং বণ্টন ব্যবস্থা আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করতে হবে।
রাতের ঘুম হারাম, পাম্পে পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড
মালিকপক্ষ অতিরিক্ত চাহিদার কথা বললেও বাস্তব চিত্র সাধারণ মানুষের জন্য চরম হতাশার। শনিবার (২৮ মার্চ) রাত থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি বাড়তে শুরু করে। সামান্য একটু তেলের আশায় অনেক চালককে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে পাম্পের সামনেই অবস্থান করতে দেখা গেছে। রোববার সকালে শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং রাজধানীর অধিকাংশ পেট্রোল পাম্প বন্ধ রয়েছে এবং অনেক পাম্পের সামনে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেককে শেষ পর্যন্ত চরম ক্ষোভ নিয়ে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে রাইড শেয়ারিং ও গণপরিবহন
এই জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় পড়েছেন মোটরসাইকেল চালক এবং রাইড শেয়ারিংয়ের ওপর নির্ভরশীল কর্মীরা। মিরপুর থেকে আসা এক রাইড শেয়ারিং চালক চরম আক্ষেপ নিয়ে জানান, রাত দুইটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে সকাল ১০টা বেজে গেলেও পাম্প কর্তৃপক্ষ তেল শেষ বলে জানিয়েছে; ফলে তাঁর সারা দিনের রুটিরুজি সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শুধু ব্যক্তিগত যান নয়, জ্বালানি সংকটের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনেও। রাস্তায় বাসের সংখ্যা অন্যদিনের তুলনায় অনেক কম থাকায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও গন্তব্যে যাওয়ার যান পাচ্ছেন না অফিসগামী যাত্রীরা। আর এই নিরুপায় অবস্থার সুযোগ বুঝে সিএনজি ও রিকশাচালকরা কয়েক গুণ অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন বলে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।
নিত্যপণ্যের বাজারেও নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা
তেল সংগ্রহ করতে এসে দিনের অর্ধেক সময় রাস্তায় পার করে দেওয়া সাধারণ মানুষ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বেসরকারি চাকরিজীবী জানান, দিনের অর্ধেক সময় যদি পাম্পের লাইনেই চলে যায়, তবে দৈনন্দিন অফিসের কাজ করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত এই জ্বালানি সমস্যার কার্যকর সমাধান না হলে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়ে নিত্যপণ্যের বাজারেও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা সাধারণ মানুষের কষ্টকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।