ইরানের জ্বালানি অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত খারগ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল অভিযান মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে কড়া সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন আন্তর্জাতিক সমর বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এই দ্বীপে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে এবং এতে ব্যাপক প্রাণহানির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
বিপর্যয়ের শঙ্কা ও সামরিক ‘ফাঁদ’
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিস মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই শঙ্কার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় ইরানিরা খারগ দ্বীপে আমেরিকানদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানোর একটি বড় সুযোগ পাবে। এতে কেবল প্রাণহানিই বাড়বে।” তিনি আরও জানান, সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলায় ইরান গত কয়েক সপ্তাহে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই দ্বীপে বিভিন্ন ধরনের সামরিক ‘ফাঁদ’ পেতেছে। সেখানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও বহুগুণ জোরদার করা হয়েছে।
ট্রাম্পের দ্বিমুখী নীতি ও আসন্ন অভিযানের শঙ্কা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরানে যে সর্বাত্মক যুদ্ধের সূচনা হয়েছে, তা এরই মধ্যে এক মাস অতিক্রম করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি দ্বিমুখী অবস্থান বা কৌশল গ্রহণ করেছেন। একদিকে তিনি আলোচনার মাধ্যমে শান্তির কথা বলছেন, আবার অন্যদিকে খারগ দ্বীপে সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের ছক কষছেন। ম্যালকম ডেভিসের ধারণা, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরিকল্পিত স্থল অভিযান শুরু করে দিতে পারে, যা চলমান সব কূটনৈতিক তৎপরতাকে পুরোপুরি নড়বড়ে করে দেবে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ‘পারস্য উপসাগরের নিঃসঙ্গ মুক্তা’?
‘পারস্য উপসাগরের নিঃসঙ্গ মুক্তা’ হিসেবে পরিচিত খারগ দ্বীপটি মূলত ইরানের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এই দ্বীপটির ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম:
ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপ থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়।
এখান থেকেই প্রধানত এশিয়ার বাজারে, বিশেষ করে চীনে সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানি করা হয়।
আবোজার, ফোরুজান ও দোরুদ—এই তিনটি প্রধান তেলক্ষেত্র থেকে আসা তেল এখানে প্রক্রিয়াজাত হয়ে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক নানা কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান এই টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়িয়ে বর্তমানে এর ধারণক্ষমতা দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করেছে।
দখলদারিত্বের নেপথ্যে মার্কিন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল রুবিন এক বিশ্লেষণী নিবন্ধে এই সম্ভাব্য অভিযানের পেছনের মার্কিন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প যদি খারগ দ্বীপটি ধ্বংস না করে পুরোপুরি দখল করতে সক্ষম হন, তবে তিনি নিশ্চিত করতে পারবেন যে ইরান সরকার তাদের আমলা ও সেনাদের আর বেতন দিতে পারবে না। এর ফলে অর্থনৈতিক ধসের মাধ্যমে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর পতন ত্বরান্বিত হতে পারে। এছাড়া ভবিষ্যতে ইরানে নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায় এলে তারা নিজেদের দেশ পুনর্গঠনের বিশাল খরচ এই দখলকৃত তেলের আয় থেকেই মেটাতে পারবে বলে পেন্টাগন মনে করছে।
ব্যর্থতার মুখে কূটনৈতিক উদ্যোগ
বর্তমানে পাকিস্তানসহ অন্তত চারটি মুসলিম দেশ এই যুদ্ধ বন্ধে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মাঠে সামরিক প্রস্তুতি ও সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিস মনে করেন, “পরিস্থিতি কোনোভাবেই শান্তির দিকে এগোচ্ছে—এমনটা বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।”