মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত এখন আর কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং এটি আমেরিকা, চীন এবং ভারতের এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে। এই খেলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিত্তে (Sittwe) বন্দর এবং কিয়াকফিউ (Kyaukphyu) বন্দর। আর এই ত্রিমুখী লড়াইয়ের মাঝখানে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য বা ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর নিরাপত্তার জন্য সিত্তে বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা থেকে সমুদ্রপথে সিত্তে হয়ে মিজোরাম পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের জন্য ভারত ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
উদ্দেশ্য: শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’-এর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি সমুদ্রপথে উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য পৌঁছানো।
বর্তমান সংকট: আরাকান আর্মি (AA) এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো (যেমন পালেতোয়া) দখল করে নিয়েছে। ফলে ভারতের এই বিশাল বিনিয়োগ এখন ভেস্তে যাওয়ার মুখে। চীনের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে আরাকান আর্মি ভারতকে চাপে রাখছে যাতে তাদের সেভেন সিস্টার্স সবসময় অস্থির থাকে।
রাখাইন রাজ্যে দুটি প্রধান বন্দর নিয়ে দুই পরাশক্তির লড়াই চলছে:
চীন: তাদের লক্ষ্য কিয়াকফিউ বন্দর এবং সেখান থেকে কুনমিং পর্যন্ত পাইপলাইন রক্ষা করা। জান্তা সরকারকে সমর্থনের পাশাপাশি চীন আরাকান আর্মির সাথেও গোপনে সমঝোতা করছে (যেমন হাইগেন চুক্তি), যাতে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়।
আমERICA: ওয়াশিংটন চায় ‘বার্মা অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে জান্তা বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে (বিশেষ করে আরাকান আর্মি) সমর্থন দিয়ে মিয়ানমারে জান্তা ও চীনা প্রভাব খর্ব করতে। সিত্তে বন্দর যদি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে এই অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাব কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
মিয়ানমারের এই অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের জন্য চারটি প্রধান কারণে চরম ঝুঁকিপূর্ণ:
ভৌগোলিক নৈকট্য: রাখাইন রাজ্যের অবস্থান সরাসরি কক্সবাজার, বান্দরবান এবং চট্টগ্রামের সীমান্তে। আরাকান আর্মির উত্থান এবং জান্তা বাহিনীর সাথে তাদের ভয়াবহ লড়াইয়ের গোলা বারুদ প্রায়ই বাংলাদেশের ভেতরে এসে পড়ছে।
বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর উত্থান: সিত্তে বন্দরের অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে যদি পাহাড়ের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো (যেমন উলফা বা এনএসসিএন) পুনরায় সক্রিয় হয় এবং আরাকান আর্মির সাথে জোট বাঁধে, তবে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ভেঙে পড়তে পারে।
মানবিক করিডোর ও লজিস্টিক সাপোর্ট: অভিযোগ আছে যে, অতীতে ডক্টর ইউনুস সরকারের সময় বা তার আগে থেকেই আরাকান আর্মিকে মানবিক করিডোর বা লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। আমেরিকার বার্মা অ্যাক্টের বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশ যদি আরাকান আর্মিকে সরাসরি বা পরোক্ষ সমর্থন দেয়, তবে চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের চরম অবনতি হতে পারে।
কাপলান পরিকল্পনা ও ‘খ্রিস্টান স্টেট’ তত্ত্ব: ব্রিটিশ আমলের সেই ‘হিল স্টেট’ বা একটি পৃথক খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা (যাতে মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশ থাকতে পারে) নিয়ে পর্দার আড়ালে গভীর ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন রয়েছে। আরাকান আর্মির এই বিজয় সেই পরিকল্পনাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, যা বাংলাদেশের মানচিত্রের জন্য হুমকি।
মার্চের শেষ সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, আরাকান আর্মি সিত্তে শহরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। নৌবাহিনীর ঘাঁটি থেকে মাত্র কয়েকশ ফুট দূরে তাদের অবস্থান। এর মধ্যেই ১৩ই মার্চ মিয়ানমার সীমান্তে ৬ জন ইউক্রেনীয় এবং ১ জন আমেরিকান নাগরিকের গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধে পশ্চিমা শক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার এখন এক কঠিন অগ্নিকুণ্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। একদিকে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ, অন্যদিকে চীনের বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং সর্বোপরি আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশ যদি ভুল করে কোনো এক পক্ষকে সমর্থন দিয়ে ফেলে (যেমন আরাকান আর্মিকে লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া), তবে অন্য দুই শক্তি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
ইতিহাস বলছে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের মহড়া এবং নভেম্বরে সেন্ট মার্টিনের রহস্যময় বিচ্ছিন্নতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল বড় কোনো দাবার চালের অংশ। এখন সিত্তে বন্দর কার হাতে যাবে, তা শুধু মিয়ানমারের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; বরং তা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ভবিষ্যৎ।
মিয়ানমার এখন আর কেবল একটি গৃহযুদ্ধকবলিত দেশ নয়, এটি এখন আমেরিকা-চীন-ভারতের ‘প্রক্সি ওয়ার’-এর ময়দান। আর বাংলাদেশ এই ময়দানের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। সিত্তে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ যার হাতেই যাক না কেন, তার প্রভাব সরাসরি পড়বে আমাদের সীমান্তে। আপনার বাড়ির আঙিনায় যদি তিনটি শক্তিশালী পক্ষ কুস্তি লড়ে, তবে আপনি কোনোভাবেই নিরাপদ নন। বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো—এই তিন পান্ডার লড়াইয়ের মাঝে নিজের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা।