প্রাচীনকালের দুর্ভেদ্য দুর্গ বা রাজপ্রাসাদের চারপাশের পরিখায় কুমির ছেড়ে দিয়ে শত্রুর আক্রমণ ঠেকানোর ঐতিহাসিক সেই কৌশল এবার আধুনিক যুগে ফিরে আসতে যাচ্ছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশ সীমান্তের দুর্গম নদীপথ ও জলাভূমি এলাকায় কুমির এবং সাপের মতো ভয়ংকর সরীসৃপ মোতায়েন করার এক অভাবনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য ফেডারেল’-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক নতুন ও বিতর্কিত অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যবর্তী ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের একটি বড় অংশই নদীমাতৃক এবং হাওর-বাওর বেষ্টিত। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পক্ষ থেকে আসা এক বিশেষ নির্দেশনার ভিত্তিতে বিএসএফ এই অদ্ভুত কিন্তু কৌশলগত পরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে। গত ২৬ মার্চ বিএসএফ-এর ইস্টার্ন এবং নর্থ-ইস্টার্ন সেক্টর সদর দপ্তরে পাঠানো এক গোপন বার্তায় জানানো হয়েছে, যেসব দুর্গম নদীপথ বা পাহাড়ি ঝরনায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া প্রায় অসম্ভব, সেখানে অনুপ্রবেশ এবং চোরাচালান ঠেকাতে সরীসৃপ মোতায়েন করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিএসএফ-এর এই বিশেষ পরিকল্পনার পেছনে মূলত জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৬,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত ২.৬৫ লাখ কর্মীর একটি বিশাল অংশ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী ডিউটির মতো অতিরিক্ত কাজে ব্যস্ত থাকে। তদুপরি, বাহিনীর প্রায় ২০ শতাংশ সদস্যের বয়স ৪৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে এবং বড় একটি অংশ শারীরিকভাবে পুরোপুরি ফিট নন। এই ক্রমবর্ধমান জনবল সংকট মোকাবিলা করতেই সীমান্ত সুরক্ষায় প্রকৃতিকে একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে ব্যবহারের চিন্তা করছে ভারত।
ভারতের এই পদক্ষেপের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেক্সিকো সীমান্ত সংক্রান্ত একটি পুরনো পরিকল্পনার অদ্ভুত মিল পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তের রিও গ্র্যান্ডে নদীতে কুমির ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন, যা সে সময় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। যদিও ট্রাম্প পরবর্তীতে বিষয়টিকে কৌতুক হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, তবে ভারত সরকার বর্তমানে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করছে। বিশেষ করে সীমান্তের প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার এলাকা এখনো বেড়াহীন, যার মধ্যে ১৭৫ কিলোমিটার এলাকা ভৌগোলিক কারণে বেড়া দেওয়ার অনুপযুক্ত।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিএসএফ-কে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘ই-বর্ডার’ বা ইলেকট্রনিক নজরদারি ব্যবস্থা চালুর কাজ করছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা যেখানে হার মানছে, সেখানে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এই আদিম অথচ ভয়ংকর পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়েছে। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে সীমান্ত নদীগুলোতে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ এবং জেলেদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই কঠোর ও বিকল্প পদ্ধতিটি নিয়ে ইতিমধেই বিভিন্ন মহলে নৈতিক ও মানবিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।