বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তন এবং বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বৈপ্লবিক পদক্ষেপগুলো থমকে যেতে বসেছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা এবং একটি স্বতন্ত্র বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জারি করা অধ্যাদেশসহ মোট ২০টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ চলতি সংসদ অধিবেশনে অনুমোদিত হচ্ছে না। ফলে আগামী ১০ এপ্রিলের পর এই সংস্কারগুলো আইনি বৈধতা হারিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পেশ করেন, যেখানে এই চাঞ্চল্যকর সুপারিশগুলো উঠে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সংস্কারগুলোর একটি ছিল ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন করে বিচারক নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
বিশেষ কমিটির যুক্তি: কমিটি এই অধ্যাদেশটিকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, এতে বিচারক নিয়োগে রাষ্ট্রপতির কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখা হয়নি এবং সরকারের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম।
একইভাবে, নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে সরিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত করার জন্য যে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ’ করা হয়েছিল, সেটিও রহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির আশঙ্কা, এটি বলবৎ থাকলে বিচার বিভাগের ওপর প্রধান বিচারপতির ‘একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠিত হবে, যা সরকারের সাথে সমন্বয়ে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করে যে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছিল, সেটিও এখনই বিল আকারে পাস না করে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
সরকারের অবস্থান: নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গেলে সরকারের ‘পূর্বানুমতি’ লাগবে—এই শর্তটি যুক্ত করতে চায় বর্তমান প্রশাসন।
বিরোধীদের আপত্তি: জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন। তাদের মতে, অনুমতির এই শর্ত মূলত অপরাধীদের ‘দায়মুক্তি’ দেওয়ার একটি নামান্তর, যা গত ১৫ বছরের গুম হওয়া পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ করবে।
জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুমোদনের লক্ষ্যে যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই ‘গণভোট অধ্যাদেশ’-কেও প্রশ্নবিদ্ধ ও অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেছে বিশেষ কমিটি। তাদের মতে, এই অধ্যাদেশ সংসদের সার্বভৌমত্ব খর্ব করেছে। এর ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের বৈধতা নিয়েও নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য এখন চার ভাগে বিভক্ত:
হুবহু বিল হিসেবে পাস (৯৮টি): এর মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণ, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর এবং আওয়ামী লীগ আমলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো রয়েছে।
সংশোধিত আকারে পাস (১৫টি): এই তালিকায় আছে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ (যেখানে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের পাশাপাশি সাজার বিধান যুক্ত হচ্ছে), পুলিশ কমিশন ও শ্রম আইন সংশোধন।
ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে (১৬টি): মানবাধিকার কমিশন, দুদক, গুম ও রাজস্ব নীতি সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো অধিকতর যাচাইয়ের জন্য রাখা হয়েছে।
সরাসরি রহিতকরণ (৪টি): বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত প্রধান তিনটিসহ মোট ৪টি অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগগুলো বাতিলের সিদ্ধান্তে আইনজীবী সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশিষ্ট আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মূলত দেশে নতুন ফ্যাসিবাদ কায়েমের পথ প্রশস্ত হচ্ছে এবং জুলাই গণ-আন্দোলনের জনআকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।”
বিভিন্ন সংগঠন, বিশেষ করে ‘ইয়াং জাজেস ফর জুডিশিয়াল রিফর্ম’ মনে করিয়ে দিয়েছে যে, খোদ বিএনপির ৩১ দফার অঙ্গীকার এবং মাসদার হোসেন মামলার রায়েও স্বতন্ত্র সচিবালয়ের কথা বলা হয়েছিল। এখন সেই পথ থেকে সরে আসাকে অনেকেই ‘জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী’ বা ‘গাদ্দারি’ হিসেবে দেখছেন।
সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশগুলো ১০ এপ্রিলের মধ্যে বিল আকারে পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। এই সময়সীমার মধ্যে যদি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো পাস না হয়, তবে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়াটি বড় ধরনের হোঁচট খাবে। সংস্কারের এই টানাপড়েনে আগামী দিনগুলোতে সংসদীয় বিতর্ক এবং রাজপথের রাজনীতি উত্তপ্ত হওয়ার জোরালো সংকেত পাওয়া যাচ্ছে।