অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি গত বৃহস্পতিবার সংসদে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। ওই প্রতিবেদনে মোট ২০টি অধ্যাদেশ কার্যত বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি সরাসরি রহিত করার জন্য সংসদে বিল আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, আর বাকি ১৬টি আপাতত বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তীতে পরিমার্জন করে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এই অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হলে আগামী ১০ এপ্রিলের পর সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারাবে।
বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন সন্ধ্যায় সংসদে এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে গত ১২ মার্চ অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপিত হওয়ার পর সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই বিশেষ কমিটি সেগুলো পর্যালোচনা করে সুপারিশ তৈরি করে। আগামী সোমবার থেকে অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে চলেছে, সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডার কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, দুর্নীতি দমন, গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়েও এখন চলছে জোরালো রাজনৈতিক বিতর্ক। সব মিলিয়ে সংস্কার প্রশ্নে আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রহিত করার জন্য বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে মোট চারটি অধ্যাদেশের বিষয়ে। এগুলো হলো জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬।
সংবিধানে বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়নের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এই অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ নামে একটি স্বতন্ত্র কাউন্সিল গঠন করা হবে এবং প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে।
একইভাবে অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটিসংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হতো এবং সার্বিক নিয়ন্ত্রণ থাকত প্রধান বিচারপতির হাতে।
জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা এই দুটি অধ্যাদেশ হুবহু বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, এই অধ্যাদেশ দুটি বিচার বিভাগকে শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও প্রশাসনিকভাবে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল।
বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, আরও ১৬টি অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তীতে পরিমার্জন করে নতুন বিল আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ আরও কয়েকটি।
গুম প্রতিরোধে ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এটি ছিল আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিধানাবলি বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার একটি বড় প্রচেষ্টা। এতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। পরবর্তীতে সংশোধনী এনে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি অন্তত পাঁচ বছর ধরে গুম থাকলে ট্রাইব্যুনাল তাঁর সম্পত্তি বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনযোগ্য ঘোষণা করতে পারবে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে এই অধ্যাদেশ ল্যাপস করার পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি থাকা জরুরি এবং জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া প্রয়োজন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, গত দেড় দশকে গুমের শিকার পরিবারগুলো কোনো ন্যায়বিচার পায়নি এবং সরকারি অনুমতির শর্ত জুড়ে দিলে তা কার্যত দায়মুক্তির পথ খুলে দেয়।
২০২৫ সালে দুদকের তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধান ক্ষমতা বাড়িয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে সরাসরি এজাহার দায়েরের বিধান রাখা হয়, বিদেশে সংঘটিত গুরুতর আর্থিক অপরাধকে আইনের আওতায় আনা হয় এবং কমিশনের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর বিধান করা হয়। এই অধ্যাদেশও এখন বিল হিসেবে সংসদে না আসার সুপারিশ করা হয়েছে। জামায়াতের সদস্যরা এর বিরোধিতা করে বলেছেন, এই অধ্যাদেশ দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এতে কমিশনকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সেই তিনটি অধ্যাদেশই এখনই বিল আকারে না আনার সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারি দলের যুক্তি হলো কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে না থাকলে তদারকির কাঠামো অস্পষ্ট থাকে। বিরোধী দল বলছে, দুদক বা নির্বাচন কমিশনও কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেই—এই যুক্তি তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
১৫টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রভৃতি।
সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। এটি সংশোধিত আকারে পাস করার সুপারিশ করা হলেও কী ধরনের সংশোধনী আনা হবে তা কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় নিষেধাজ্ঞা অমান্যের বিরুদ্ধে সাজার বিধান যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাকি ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে সংসদে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণ অধ্যাদেশ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন অধ্যাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশসহ বেশ কিছু অধ্যাদেশ।
১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ কমিটিতে থাকা জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য নোট অব ডিসেন্ট বা আনুষ্ঠানিক ভিন্নমত জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে তাঁদের এই ভিন্নমতের উল্লেখ রাখা হয়েছে। মূলত বিচার বিভাগ সংস্কার, গুম প্রতিরোধ, দুদকের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালীকরণ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে জামায়াতের সদস্যরা সরকারি দলের অবস্থানের সঙ্গে একমত হননি।
সামগ্রিকভাবে ২০টি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা হারানোর এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পশ্চাদপসরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই অধ্যাদেশগুলো যদি পরিমার্জিত আকারেও ভবিষ্যতে না আসে, তাহলে সংস্কারের পথে অগ্রগতি আরও কঠিন হয়ে পড়বে।